মেহেদী সম্রাট এর ছোট গল্প || ল্যাম্পপোষ্ট - সেরা-সংগ্রহ.কম
X

Friday, March 18, 2016

মেহেদী সম্রাট এর ছোট গল্প || ল্যাম্পপোষ্ট

ল্যাম্পপোষ্ট

মেহেদী সম্রাট




'ল্যাম্পপোস্ট' ||মেহেদী সম্রাট

রাস্তাটা একেবারেই জনশূন্য । মৃদু আলোকিত হলেও রাস্তার দু'পাশে বিস্তৃত অন্ধকার । দীর্ঘক্ষন পরপর দু'একটা কার্গো কিংবা ট্রাক ছুটে যাচ্ছে সাঁ সাঁ শব্দে । মাঝে মাঝে অদৃশ্য কোন জায়গা থেকে বেশ
কয়েকটা কুকুরের ঝগড়া শোনা যায় । কখনো কখনো দু'একটা সামনেও পড়ে । বড় অদ্ভুত ওরা..! মানুষ দেখলে দৌড়ে পালায় না । বরং রাস্তার উপর এমন ভাব ধরে দাড়িয়ে থাকে যেন ওরাই এ পথের রাজা !!
রাত তখন প্রায় দু'টো বাজে । পরনে জিন্স, গায়ে টি- শার্ট আর পায়ে কনভার্স । গলায় ঝুলছে একটা
ক্যামেরা । মাথার এলোমেলো চুলের কয়েকটা এসে পরেছে চশমার লেন্সের উপর । বাঁ হাতের দুই আঙ্গুলের
মাঝে একটা জ্বলন্ত সিগারেট । সিগারেটের অর্ধেক টা ইতোমধ্যেই ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিশে গেছে
টানে টানে । নির্জন রাস্তায় একা একা হাঁটতে গা ছমছম করে রেজা'র । তাই সঙ্গী হিসেবেই এই সিগারেটের প্যাকেটটা টা আনা...

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রেজা । ইদানিং তার একটা অদ্ভুত শখ কোথা থেকে যেন আবির্ভূত হয়েছে । শখটি হলো, সে রাতের ঢাকায় একা একা ঘুরবে । তারপর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা ফিচার লিখবে । রেজা বেরিয়েছে রাত ১২টার কিছু আগে । এখন সময় রাত দুটো । গত দুই ঘন্টা যাবত নির্জন রাজপথে একা একা ঘুরছে সে । এখনো তেমন কিছুই দেখেনি যা মনে
রাখার মতো । দেখার মধ্যে শুধু দুটো ট্রাক, তরকারি বোঝাই একটা মিনি পিকআপ, আর দু'তিনটে কুকুর ছাড়া অন্য কিছুই না । এখনো কোন মানুষ চোখে পড়েনি । তবে হাটার পুরো সময়টা জুড়ে একটা কমন বস্তু দেখেছে সবখানে । রাস্তার দু'পাশে সারি সারি 'প্রদীপের খুঁটি' । যাকে আমরা বাঙালিরা স্মার্ট ইংরেজিতে
'ল্যাম্পপোস্ট' বলেই চিনি । অনেকেই আবার 'স্ট্রীট লাইট' ও বলি । হাটতে হাটতে হঠাৎ ফুটপাতের অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা জায়গায় কিছু একটা নড়ে উঠতে দেখলো রেজা..!! অনেকটা কৌতুহল বশতই এগিয়ে গেলো সেদিকে । কাছে গিয়ে দেখলো ফুটপাতের অন্য জায়গার তুলনায় এখানে আলো কিছুটা কম । কারণ হিসেবে খুঁজে পেল এখানের প্রদীপের খুঁটি টা জ্বলছে না । যাই হোক, দূর থেকে আসা মৃদু আলোর রেখায় রেজা দেখতে পেল নড়ে ওঠা বস্তুটা । ময়লা কাপলের একটা স্তুপ মনেহলো । পাশেই দুটো কুকুর, একটা শুয়ে আর একটা বসে আছে । রেজা ভাবলো একটা ছবি তুলে রাখা যায়.! ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে ঝটপট দু'তিনটে ছবি তুলে নিল । ক্যামেরার ফ্লাস লাইটের আলো তে আবার কেঁপে উঠলো ময়লা কাপরের স্তুপ । স্তুপের নিচ থেকে ধরফর করে উঠে বসলো একজন মানুষ..! কুকুর দু'টিও ইতোমধ্যে চেচাঁনো শুরু করে দিয়েছে । রেজার দিকে একবার ঘার ঘুড়িয়ে তাকিয়ে আবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো লোকটি । বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে মিনিট দু'য়েক দাড়িয়ে থাকলো রেজা.... তারপর আবার হাটতে শুরু করলো । একটা সিগারেট ধরালো । কিছুদূর এগিয়ে বারবার ইচ্ছে করছিলো পিছন ফিরে দেখতে । কিন্তু ভয়ে রেজা আর ফিরে তাকায়নি, বরং যথা সম্ভপ দ্রুত হেটে নিরাপদে যেতে চাইছে । রেজার ভয় হচ্ছিল এই বুঝি লোকটি উঠে তাকে চেপে ধরবে মৌলিক অধিকার চেয়ে...!!

...ময়লা কাপড়ের স্তুপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষের সেই ফুটপাত থেকে অনেক দুরে চলে এসেছে রেজা । শহরের একটা উদ্যানের পাশের রাস্তা ধরে হাটছে এখন । এ রাস্তায় অবশ্য কয়েকজন মানুষ চোখে পড়লো । একজন রিকশা ওয়ালা যাত্রিশূন্য রিকশা নিয়ে গান গাইতে গাইতে ছুটে চলেছে । গানের
ফাঁকে ফাঁকে মনের সুখে বিড়িতে লম্বা লম্বা টান দিচ্ছে । কয়েকজন তরুণ কে দেখা গেল সাইক্লিং করছে । দু'টো পুলিশ চেকপোস্ট ও চোখে পড়েছে । বসে বসে ঝিমুচ্ছে কয়েকজন পুলিশ । গভীর রাতে এই নির্জন রাস্তায় সবচেয়ে বেশি যে প্রাণীটি কে দেখেছে রেজা সেটি হল কুকুর । রাস্তার প্রায় প্রতিটি মোড়েই ওদের দখলদারিত্ব । রেজা অনুমান করতে চেষ্টা করে, কতগুলো কুকুর আছে এই শহরে.? কিন্তু পারেনা । অন্ধকারে প্রশ্নও ছুড়ে দেয় অস্ফুটে । কিন্তু উত্তর পায় না । আনমনেই সিদ্ধান্ত নেয় সময় সুযোগ হলে একবার পুরো শহরে কুকুর শুমারি করবে.. এসব ভাবতে ভাবতে উদ্যানের পাশের রাস্তাটা ধরে অনেকদুর চলে এসেছে রেজা । একনাগারে অনেকক্ষন হাটাহাটি করে কিছুটা ক্লান্ত সে । মনে মনে ভাবে খানিকটা ঝিরিয়ে নিলে মন্দ হত না..!

রাস্তার পাশে উচুঁ ফুটপাতে একটা ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় বসলো রেজা । নিস্তব্দ আধার রাতে মাথা উচুঁ করে দাড়িয়ে আছে 'আলোর খুঁটি' গুলো । আঁকাবাকা রাজপথ কে আলোকিত করে রেখেছে পুরো শহর জুড়ে ।
দূরের রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয় যেন আলোর সুরঙ্গ..! এখানে বসে কয়েকটা ছবি তুললো রেজা । মৃদু বাতাস বইছে । বাতাসে ধুলোবালি নেই, দূর্গন্ধ নেই । থেমে থেমে দু'একটা নিশাচর পাখির ডাক শোনা
যাচ্ছে..

একটা সিগারেট ধরালো সে । তারপরই ভাবে, নিকোটিন কি মানুষের নিঃসঙ্গতা দূর করতে পারে..? হয়তো পারে, কিংবা পারেনা । আসলে এটা হলো মানুষের কল্পনা শক্তির ব্যাপার । মানুষ যেটাকে যেরকম ভাবে চিন্তা করে সেটাকে তার সেরকমই মনে হয় । তবে সিগারেট কে ভালো কিছু ভাবাটা
মোটেই যৌক্তিক নয়..

এসব ভেবে তবুও নিকোটিন ফুঁকছে রেজা । আসলে এটাই মানুষের প্রকৃতি..! মানুষ নিয়ম ভাঙতে পছন্দ করে । এমনকি ভাঙার জন্যেই তারা নতুন নতুন নিয়ম তৈরি
করে..! বড়ই অদ্ভুত...!!

..... রেজা হঠাৎ খেয়াল করল তার ডান পাশের ল্যাম্পপোস্ট টাকে মাঝে রেখে ওপাশে একটা মেয়ে এসে বসেছে । মেয়েটা দেখতে মোটামুটি সুন্দর। কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে । রেজা তাকালো মেয়েটার দিকে । বয়স কত হবে..? ষোল কি সতেরো..! আঠারো ও হতে পারে । মেয়েটাও রেজার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে । হঠাৎ মেয়েটি তার ব্যাগ থেকে আয়না বের করে সাঁজতে শুরু করল..! ঠোঁঠে লিপস্টিক লাগালো, কপালে একটা লাল টিপ পড়ল । রেজা আশ্চর্য
হয়ে মেয়েটার কান্ড কারখানা দেখতে লাগলো । মেয়েটি তখনো তার দিকে তাকিয়ে হাসছে । রেজা জিজ্ঞেস করলো-

-এই কে তুমি..?
-ক্যান চোখে দ্যাখেন না.! আমি জ্বলজ্যান্ত মাইয়া মানুষ ।
-এত রাতে এখানে কি করছো..??
-আপনেগো লাইগা ই ঘুরতাছি ।
-আমাদের জন্য ঘুরতেছ মানে..!!
-হইছে আর ডঙ করোন লাগবোনা..! আপনে এত রাইতে এইহানে ক্যান আইছেন, মাইয়া মানুষ খুঁজতে আহেন নাই..??
-আশ্চর্য...!! আমি কেন মেয়ে মানুষ খুঁজতে আসবো..?
-ও বুচ্চি..! আপনে হইলেন দুধের পোলা.. ।
-দুধের পোলা মানে..!!
-মানে হল অবুঝ । হোনেন, আমরা হইলাম খারাপ মাইয়্যা মানুষ । গতর বেইচ্চা খাই । আপনের মত অনেক
ভদ্রলোকেরা আমাগো কাছে আহে । বুঝছেন..?
-ছি ছি ছি..! তোমরা এত অসামাজিক কাজ কেন করো..? অন্যকিছু করেও তো খেতে পারো ।
-হোনেন ভাই, ওহ্ হো.. আপনেরে ভাই ডাইকা ফালাইলাম..!! কিছু মনে কইরেন না । (বলতে থাকে মেয়েটি..) 

সংসারের জোয়াল কান্ধে লইয়া গ্রাম থেইকা শহরে আইছি । আপনেগো এই সমাজ কিংবা সরকার আমাগোরে কোন কাম দেয় নাই । বরং কাঁচা মাংসের গন্ধ পাইয়া আপনেগো মত ভদ্রলোকেরা বারবার অন্ধকার ঘরে টাইন্যা নিতে চাইছে । তয় হেরা কাম না দিলে কি হইবো, ভাগ্য গরীব মাইনষের পাশে থাকে (!)। আর হেই ভাগ্যই আমাগোরে এই অন্ধকার রাইতের কাম জোটাইয়া দিছে.. । এহন অন্তত
দিনের বেলায় আপনেগো ভদ্র সমাজের মাইনষের লগে মিশ্যা, তিন বেলা দুই মুঠ ডাইল ভাত খাইয়া বাঁচতে
পারি..!

মেয়েটি এই পর্যন্ত বলেই হঠাৎ থামল । শাড়ির আচঁলে চোখ মুছলো । হয়ত তার চোখ ভিজে উঠেছিল, কিংবা চোখে কিছু ঢুকেছে ! রেজা এতক্ষন ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মত মেয়েটার কথা শুনেই যাচ্ছিল...
রেজা এবার মেয়েটির নাম জানতে চাইলো,

-নাম কি তোমার..?
-আপনে আমার নাম জাইন্যা কি করবেন..?
-তুমি না আমাকে ভাই ডেকেছো..! ভাই কি বোনের নাম জানতে পারে না..?
-হ পারে । আমার নাম ফুলবানু । তয় এইডা ছদ্মনাম । আসল নাম হেলেনা ।

কথা চলছিল রেজা আর হেলেনার মধ্যে । ঠিক এ সময়ই একটু দূরে দাড়িয়ে একজন লোক শিস বাজাচ্ছে । উঠে দাড়ালো হেলেনা ওরফে ফুলবানু । উঠে দাড়ালো রেজাও । মেয়েটি বলল, 'জাইগা ভাই, কাষ্টমার আইছে' । বলেই চলতে শুরু করল হেলেনা । রেজা তাকিয়ে থাকলো মেয়েটির চলে যাওয়া পথের দিকে... শিস দেওয়া লোকটির হাত ধরে হেলেনা হেঁটে যাচ্ছে উদ্যানের অন্ধকারের দিকে । হেলেনার সাথের লোকটির গোপন ইশারায় আরো কয়েকজন লোক ওদের পিছু নিয়েছে নিঃশব্দে, হেলেনার অগোচরে । একসময় তারা মিলিয়ে গেল অন্ধকারের মাঝে । রেজা তখনো ঠায় দাড়িয়ে আছে ল্যাম্পপোস্টের নিচে । সে অনুধাবন করতে চেষ্টা করছে ঘটে যাওয়া ঘটনা টা স্বপ্ন না বাস্তব..!

কিছুক্ষন পরে সেই অন্ধকার উদ্যান থেকে ল্যাম্পপোস্টের আলোতে বেরিয়ে এল কয়েকজন লোক । যারা হেলেনার সাথে গিয়েছিল । ওরা ফাঁকা রাস্তায় হেলে দুলে হাটছে আর উচ্চস্বরে হাসছে । ভাব
দেখে মনে হচ্ছে এ যেন বিজয়ের হাসি...!

.....দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে । কুকুরের চিৎকার আর লোকগুলোর হাসির শব্দ রেজার কানে একাকার হয়ে বাজছে । রেজা ভাবে এরা হয়তো কুকুরেরই জাত ভাই..!! তাই কুকুর শুমারির সাথে সাথে এদেরও একটা শুমারি করতে হবে । আর দাড়িয়ে থাকতে পারে না রেজা । ধীরে ধীরে বাসার দিকে পা বাড়ায়....
এর বেশ কিছুদিন পরে একটা দৈনিক পত্রিকায় রেজার একটি লেখা প্রকাশিত হয় । লেখাটির শিরোনাম ছিল এরকম, 'ভাসমান মানুষের সামাজিক অধিকার' ।


ইবুক হিসাবে ডাউনলোড করুনঃ

Click To Download
৬০৬ KB .Pdf


Post Top Ad


Download

click to begin

6.0MB .pdf