স্মৃতিময় বৈশাখ - মেহদী সম্রাট - সেরা-সংগ্রহ.কম
X

Thursday, April 14, 2016

স্মৃতিময় বৈশাখ - মেহদী সম্রাট

স্মৃতিময় বৈশাখ

-মেহদী সম্রাট



তখন বেশ ছোট ছোট ছিলাম আমরা। ১৯৯৭/৯৮ সাল হবে। প্রতি বছরই শীত কিংবা গ্রীষ্মে বেড়াতে যাওয়া হতো। অধিকাংশ সময়ই নানা বাড়িতেই যেতাম।

তো ঐ ৯৭/৯৮ সালে আমরা বেড়াতে গেলাম বৈশাখ কে সামনে রেখে। চৈত্রের শেষের দিকে এরকমই কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে আব্বু-আম্মুর হাত ধরে যাত্রা করলাম। ঢাকার ডেমরা থেকে বরিশাল এর পিরোজপুর। পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার, উত্তর ভিটাবাড়িয়া গ্রামে। 
তখনো নানুদের এলাকার বেশকিছু প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট মাটির। অর্থাৎ পায়েচলা মেঠোপথ। হাঁটতে হতো অনেক। আর বৃষ্টির দিনে তো কথাই নাই..! হাঁটুকাদা আর বৃষ্টিজলে মাখামাখি হয়ে পথ চলতে হয়। কখনোবা পিছলে পরে হাত, পা কিংবা কোমরও ভাঙতো কারো কারো। বড় বড় খাল ছিলো পথের কিছুদূর পরপরই। খালের উপর ছিলো সাঁকো। সে সাঁকোগুলো বেশিরভাগই হতো বাঁশ অথবা সুপুরি গাছের তৈরি। সেই সাঁকো ভেঙে সবশুদ্ধ খালে পরে গিয়ে জোয়ারের পানিতে হাবুডুবু খাওয়ার স্মৃতি ঐ পথে চলাচলকারী প্রায় প্রত্যেকেরই আছে।

সে যাই হোক, চৈত্রের শেষে গিয়েছিলাম বলে কাঁদাজলে লুটোপুটি খেতে হয়নি যদিও। কিন্তু রোদের প্রখরতা থেকে বাঁচতে মাঝে মধ্যেই থামতে হয়েছে পথের ধারে প্রকাণ্ড গাছের ছায়ায়। সেইবারই প্রথম আমি ভালোভাবে পরিচিত হই 'হালখাতা'র সঙ্গে। নানুদের গ্রামে তখন একটাই মাত্র বাজার ছিলো। সপ্তাহে দু'দিন হাট বসতো। রবিবার আর বৃহস্পতিবার। 'মোল্লার হাট' নাম। এখনো আছে।
যেহেতু হাট বেশ দূরে এবং সপ্তাহে মোটে দুইটা দিন 'হাট' মিলে। সে জন্যই গ্রামের মানুষের টুকিটাকি চাহিদা মেটানোর জন্য গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু দোকানপাট গড়ে উঠতে শুরু করেছিলো তখনি। নিজ বাড়ির সামনে বাঁশ, কাঠ আর সুপুরির খোল এর ছাউনিতে গড়ে উঠতো সেসব দোকান। চৈত্রের এই শেষ দিকে এসে সেসব দোকান গুলোতে শুরু হতো উৎসবের প্রস্তুতি।

বৈশাখের প্রথমদিন হতো 'হালখাতা' উৎসব। নিজেদের সাধ্যমত দোকানের আঙ্গিনা সাজাতো ঐ সকল ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা। সারাদিন বাজতো ভাড়া করে আনা ব্যাটারিচালিত মাইক। বাজতো ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি, জারি, সারি সহ নানান গান। এইদিন দোকানে আগতদের জন্য মিষ্টিমুখ এর ব্যবস্থা করতো দোকানিরা। সবাই খুশিমনে দোকানে যেতো। মিষ্টমুখ করতো। গান শুনতো। সেবার আমিও গিয়েছিলাম। নানা বাড়ির আমার সমবয়েসীদের সঙ্গে। হয়তো বড়রাও ছিলেন কেউ কেউ। পুরোপুরি মনে নাই। সুনিবিড় ছায়াঘেরা গ্রাম্য পথে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন দোকানে যেতাম, আর মজা করতাম ভীষন। এদিন দোকানিরা নতুন হিসেবের খাতা খুলতো। তার গ্রাহকরাও এদিন পুরনো দেনাপাওনা মিটিয়ে নতুন বছর শুরু করতো। এভাবেই দারুণ এক উৎসবময় পরিবেশে কাটতো তখনকার পহেলা বৈশাখ।

আর এখন.! বৈশাখ আসে ঠিকই। নতুন হিসেবের খাতাও হয়তো খোলা হয়। কিন্তু আগের সেই উৎসব মূখর পরিবেশ আজ সত্যিই বড় দূর্লভ। আজকাল বরং বৈশাখে নারী নির্যাতনের দগদগে ঘাঁ আমাদের বয়ে বেড়াতে হয়......

Post Top Ad


Download

click to begin

6.0MB .pdf