হাদিস ১১১
মূসা (র)… আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী বলেছেনঃ ‘আমার নামে তোমরা নাম রেখ; কিন্তু আমার উপনামে (কুনিয়াতে) তোমরা উপনামে রেখ না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় রুপ ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’

হাদিস ১১২
মুহাম্মদ ইবন সালাম (র) আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি ‘আলী (রা)- কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাদের কাছে কি লিখিত কিছু আছে? তিনি বললেনঃ ‘না, কেবলমাত্র আল্লাহর কিতাব রয়েছে, আর সেই বুদ্ধি ও বিবেক, যা একজন মুসলিমকে দান করা হয়। এ ছাড়া যা কিছু এ পত্রটিতে লেখা আছে।’ আবূ জুহায়ফা (রা) বলেন, আমি বললাম, এ পত্রটিতে কি আছে? তিনি বললেন, ‘দিয়াতের (আর্থির ক্ষতিপূরণ) ও বন্দী মুক্তির বিধান, আর এ বিধানটিও যে, ‘মুসলিমকে কাফিরের বিনিময়ে হত্যা করা যাবে না।’

হাদিস ১১৩
আবূ নু‘আয়ম ফাযল ইবন দুকায়ন (র)…আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের কালে খুযা‘আ গোত্র লায়স গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করল। এ হত্যা ছিল তাদের এক নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ স্বরূপ, যাকে ইতিপূর্বে লায়স গোত্রের লোক হত্যা করেছিল। তারপর এ খবর নবী – এর কাছে পোঁছল। তিনি তাঁর উটের উপর আরোহণ করে খুতবা দিলেন, তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা‘আলা মক্কা থেকে ‘হত্যা’- কে (অথবা বর্ণনাকারী বললেন) ‘হাতী’- কে রোধ করেছেন।

ইমাম বুখারী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ ‘হত্যা’ বলেছেন না ‘হাতী’ বলেছেন এ ব্যাপারে বর্ণনাকারী আবূ নু‘আয়ম সন্দেহ পোষণ করেন। অন্যেরা শুধু ‘হাতী’ শব্দ উল্লেখ করেছেন। অবশ্য মক্কাবাসীদের উপর রাসূলুল্লাহ এবং মু’মিনগনকে (যুদ্ধের মাধ্যমে) বিজয়ী করা হয়েছে। জেনে রাখ, আমার পূর্বে কারো জন্য মক্কা (নগরীতে লড়াই করা) হালাল করা হয়নি এবং আমার পরও কারো জন্য হালাল হবে না। জেনে রাখ, তাও আমার জন্য দিনের কিছু সময় মাত্র হালাল করা হয়েছিল। আরো জেনে রাখ, আমার এই কথা বলার মুহূর্তে আবার তা হারাম হয়ে গেছে। সেখানকার কোন কাঁটা ও কোন গাছপালা কাটা যাবে না এবং সেখানে পড়ে থাকে কোন বস্তু কুড়িয়ে নেওয়া যাবেনা। তবে ঘোষণা করার জন্য নিতে পারবে। আর যদি কেউ নিহত হয়, তবে তার আপনজনের জন্য দুটি ব্যবস্থার যে কোন একটির অধিকার রয়েছে। হয় তার ‘দিয়াত নিবে নয় ‘কিসাস’ গ্রহণ করবে। এরপর ইয়ামানবাসী এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! (এ কথাগুলো) আমাকে লিখে দিন। তিনি (সাহাবীদের) বললেনঃ তোমরা তাকে (আবূ শাহকে) লিখে দাও। তারপর একজন কুরায়শী [আব্বাস (রা)] বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! গাছপালা কাটার নিষেধাজ্ঞা হতে ইযখির বাদ রাখুন। কারণ তা আমরা আমাদের ঘরে ও কবরে ব্যবহার করি।’ নবী বললেন, ‘ইযখির ছাড়া, ইযখির ছাড়া।’

*ইযখির – শন জাতীয় এক প্রকার ঘাস।

হাদিস ১১৪
আল ইবন ‘আবদুল্লাহ (র)… আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী –এর সাহাবীগণের মধ্য ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর (রা) ব্যতীত আর কারো কাছে আমার চাইতে বেশী হাদীস নেই। কারণ তিনি লিখে রাখতেন, আর আমি লিখতাম না। মা‘মার (র) হাম্মাম (র) সূত্রে হুরায়রা (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

হাদিস ১১৫
ইয়াহিয়া ইবন সুলায়মান (র)… ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী –এর রোগ যখন বেড়ে গেল তখন তিনি বললেনঃ ‘আমার কাছে কাগজ কলম নিয়ে এস, আমি তোমাদের এমন কিছু লিখে দিব যাতে পরবর্তীতে তোমরা ভ্রান্ত না হও।’ ‘উমর (রা) বললেন, ‘নবী – এর রোগ যন্ত্রণা প্রবল হয়ে গেছে (এমতাবস্থায় কিছু বলতে বা লিখতে তাঁর কষ্ট হবে)। আর আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব রয়েছে, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট।’ এতে সাহাবীগণের মধ্য মতবিরোধ দেখা দিল এবং শোরগোল বেড়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। আমার কাছে ঝগড়া-বিবাদ করা উচিত নয়।’ এ পর্যন্ত বর্ণনা করে ইবন আব্বাস (রা) (যেখানে বসে হাদীস বর্ণনা করছিলেন সেখান থেকে) এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন যে, ‘হায় বিপদ, সাংঘাতিক বিপদ! রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর লেখনীর মধ্যে যা বাধ সেধেছে।’

হাদিস ১১৬
সাদাকা, ‘আমর ও ইয়াহিয়া ইবন সা‘ঈদ (র) উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক রাতে নবী করীম ঘুম থেকে জেগে বলেনঃ সুবহানআল্লাহ! এ রাতে কতই না বিপদাপদ নেমে আসছে এবং কতই না ভন্ডার খুলে দেওয়া হচ্ছে! অন্য সব ঘরের মহিলাগণকেও জানিয়ে দাও, ‘বহু মহিলা যারা দুনিয়ায় বস্ত্র পরিহিতা, তারা আখিরাতে হবে বস্ত্রহীনা।’

হাদিস ১১৭
সা‘ঈদ ইবন ‘উফায়র (র)… ‘আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী তাঁর জীবনের শেষের দিকে আমাদের নিয়ে ‘ইশার সালাত আদায় করলেন। সালাম ফিরাবার পর তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, তোমরা কি এ রাতের সম্পর্কে জান? বর্তমানে যারা পৃথিবীতে রয়েছে, একশ বছরের মাথায় তাদের কেউ আর বাকী থাকবে না।

হাদিস ১১৮
আদম (র)…ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার খালা নবী এর সহধর্মিণী মায়মূনা বিনত হারিস (রা)-এর ঘরে এক রাত্রি যাপন করছিলাম। নবী তাঁর পালার রাতে সেখানে ছিলেন। নবী ‘ইশার সালাত আদায় করে তাঁর ঘরে চলে আসলেন এবং চার রাক‘আত সালাত আদায় করে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষ্ণণ পর উঠে বললেনঃ বালকটি কি ঘুমিয়ে গেছে? বা এ ধরনের কোন কথা বললেন। তারপর (সালাতে) দাঁড়িয়ে গেলেন, আমিও তাঁর বাঁ দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে তাঁর ডান দিকে এনে দাঁড় করালেন। তারপর তিনি পাঁচ রাক‘আত সালাত আদায় করলেন। পরে আরো দু’ রাক‘আত আদায় করলেন। এরপর শুয়ে পড়লেন। এমনকি আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। এরপর উঠে তিনি (ফজরের) সালাতের জন্য বের হলেন।

হাদিস ১১৯
‘আবদুল ‘আযীয ইবন ‘আবদুল্লাহ (র)… আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ লোকে বলে, আবূ হুরায়রা (রা) বড় বেশী হাদীস বর্ণনা করে। (জেনে রাখ,) কিতাবে দুটি আয়াত যদি না থাকত, তবে আমি একটি হাদিসও বর্ণনা করতাম না। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেমঃ “আমি সেসব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পরও যারা তা গোপন রাখে আল্লাহ তাদেরকে লা‘নত দেন এবং অভিশাপকারিগণও তাদেরকে অভিশাপ দেয় কিন্তু যারা তওবা করে এবং নিজদিককে সংশোধন আর সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, ওরাই তারা, যাদের প্রতি আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (২:১৫৯-১৬০) (প্রকৃত ঘটনা এই যে,) আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে কেনাবেচায় এবং আমার আনসার ভাইয়েরা জমা-জমির কাজে মশগুল থাকত। আর আবূ হুরায়রা (রা) (খেয়ে না খেয়ে) তুষ্ট থেকে রাসূলুল্লাহ –এর সঙ্গে লেগে থাকত। তাই তারা যখন উপস্থিত থাকত না, তখন সে উপস্থিত থাকত এবং তারা যা মুখস্থ করত না সে তা মুখস্থ রাখত।

হাদিস ১২০
আবূ মুস‘আব আহমদ ইবন আবূ বাকর (র)… আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আমি আপনার কাছ থেকে বহু হাদীস শুনি কিন্তু ভুলে যাই।’ তিনি বলবেন তোমার চাদর খুলে ধর। আমি খুলে ধরলাম। তিনি দু’হাত অঞ্জলী করে তাতে কিছু ঢেলে দেওয়ার মত করে বললেনঃ এটা তোমার বুকের সাথে লাগিয়ে ধর। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। এরপর আমি আর কিছুই ভুলিনি।

হাদিস ১২১
ইবরাহীম ইবনুল মুনযির (র)… ইবন আবূ ফুদায়ক (র) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন এবং তাতে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ তাঁর হাত দিয়ে সে চাদরের মধ্য (কিছু) দিলেন।

হাদিস ১২২
ইসমা‘ঈল (র)…আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ থেকে ইলমের দুটি পাত্র মুখস্থ করে রেখেছিলাম। তার একটি পাত্র বিতরণ করে দিয়েছি। আর অপরটি প্রকাশ করলে আমার কন্ঠনালী কেটে দেওয়া হবে। আবূ আবদুল্লাহ (র) বলেন, হাদীসে উল্লিখিত শব্দের অর্থ খাদ্যনালী।

হাদিস ১২৩
হাজ্জাজ (র)… জারীর (রা) থেকে বর্ণিত যে, বিদায় হজ্জের সময় নবী তাকে বললেনঃ তুমি লোকদেরকে চুপ করিয়ে দাও, তারপর তিনি বললেনঃ ‘আমার পরে তোমরা কাফির (এর মত) হয়ে যেও না যে, একে অপরের গর্দান কাটবে।’

হাদিস ১২৮
আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-মুসনাদী (র)… সা‘ঈদ ইবন জুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি ইবন ‘আব্বাস (রা)- কে বললাম, নাওফ আল-বাকালী দাবী করে যে, মূসা (আ)[যিনি খাযির (আ)- এর সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন] বনী ইসরাঈলের মূসা নন বরং তিনি অন্য এক মূসা। (একথা শুনে তিনি) তিনি বললেনঃ আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। উবাঈ ইবন কা‘ব (রা) নবী থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ইরশাদ করেনঃ মূসা একবার বনী ইসরাঈলদের মধ্য বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন। তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, সবচাইতে জ্ঞানী কে? তিনি বললেন, ‘আমি সবচাইতে জ্ঞানী।’ মহান আল্লাহ তাঁকে সতর্ক করে দিলেন। কেননা তিনি ইলমকে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করেন নি। তারপর আল্লাহ তাঁর নিকট এ ওহী পাঠালেনঃ দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে আমার বান্দাদের মধ্য এক বান্দা রয়েছে, যে তোমার চাইতে বেশী জ্ঞানী। তিনি বলেন, ‘ইয়া রব! কিভাবে তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে?’ তখন তাঁকে বলা হল, থলের মধ্য একটি মাছ নিয়ে নাও। এরপর যেখানে সেটি হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তাঁকে পাবে। তারপর তিনি রওয়ানা হলেন এবং ইউশা‘ ইবন নূন নামক তাঁর একজন খাদিমও তাঁর সাথে চলল। তাঁরা থলের মধ্য একটি মাছ নিলেন। চলার পথে তাঁরা একটি বড় পাথরের কাছে এসে, সেখানে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। তারপর মাছটি (জীবিত হয়ে) থলে থেকে বেরিয়ে গেল এবং সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রে চলে গেল। এ ব্যাপারটি মূসা (আ) ও তাঁর খাদিম-এর জন্য ছিল আশ্চর্যের বিষয়। এরপর তাঁরা তাঁদের বাকী রাতটুকু এবং পরের দিনভর চলতে থাকলেন। পরে ভোরবেলা মূসা (আ) তাঁর খাদিমকে বললেন, ‘আমাদের নাশতা নিয়ে এস, আমরা আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আর মূসা (আ) কে যে স্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সে স্থান অতিক্রম করার পূর্বে তিনি ক্লান্ত অনুভব করেন নি। তারপর তাঁর খাদিম তাঁকে বলল, ‘আপনি কি লক্ষ্য করেছন, আমরা যখন পাথরের পাশে বিশ্রাম করছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছি? মূসা (আ)বললেন, ‘আমরা তো সেই স্থান্টিই খুঁজছিলাম। তারপর তাঁরা তাঁদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলল। তাঁরা সেই পাথরের কাছে পোঁছে, কাপড়ে আবৃত (বর্ণনাকারী বলেন) কাপড় মুড়ি দেওয়া এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। মূসা (আ) তাঁকে সালাম দিলেন। তখন খাযির বললেন, এ দেশে সালাম কোথা থেকে এল! তিনি বললেন, ‘আমি মূসা।’ খাযির জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বনী ইসরাইলের মূসা (আ)?’ তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি আরো বললেন, “আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি এ শর্তে যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন? খাযির বললেন, “তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না।” ‘মূসা (আ) বললেন, “আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার আদেশ অমান্য করব না। তারপর তাঁরা দুজন সমুদ্র তীর দিয়ে চলতে লাগলেন, তাঁদের কোন নৌকা ছিল না। ইতিমধ্যে তাঁদের কাছ দিয়ে একটি নৌকা যচ্ছিল। তাঁরা নৌকাওয়ালাদের সঙ্গে তাঁদের আরোহণ করিয়ে নেওয়ার কথা বললেন। তারা খাযিরকে চিনতে পারল এবং ভাড়া ব্যতিরেকে তাঁদের নৌকায় তুলে নিল। তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার এক প্রান্তে বসে দুই-একবার সমুদ্রে তার ঠোঁট মারল। খাযির বললেন, ‘হে মূসা (আ)! আমার ইলম ইবং তোমার ইলম (সব মিলেও) আল্লাহর ইলম থেকে সমুদ্র থেকে চড়ুই পাখি্র ঠোঁটে যতটুকু পানি এসেছে ততটুকু পরিমাণও কমাতে পারবে না।’ এরপর খাযির নৌকার তক্তাগুলির মধ্য থেকে একটি খুলে ফেললেন। মূসা (আ) বললেন, এরা আমাদের ভাড়া ছড়া আরোহণ করিয়েছে, আর আপনি আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য নৌকায় ফাটল সৃষ্টি করলেন?’ খাযির বললেন, “আমি কি বলিনি যে, তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না।” মূসা (আ) বললেন, ‘আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার ব্যাপারে অধির কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।’ বর্ণনাকারী বলেন, ইহা মূসা (আ) এর প্রথম ভুল। তারপর তাঁরা উভয়ে (নৌকা থেকে নেমে) চলতে লাগলেন। (পথে) একটি বালক অন্যান্য বালকের সাথে খেলছিল। থাযির তার মাথার উপর দিক দিয়ে ধরলেন এবং হাত দিয়ে তার মাথা ছিদ্র করে ফেললেন। মূসা (আ) বললেন, ‘আপনি কি একটি নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন কোন হত্যার অপরাধ ছাড়াই?’ খাযির বললেন, “আমি তোমাকে বলিনি যে, তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না?” ইবন ‘উয়ায়না (র) বলেন, এটা ছিল পূর্বের চেয়ে বেশী জোরালো। তারপর আবারো চলতে লাগলেন; চলতে চলতে তাঁরা এক গ্রামের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের কাছে খাবার চাইলেন, কিন্তু তারা তাঁদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। তারপর সেখানে তাঁরা এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেলেন। খাযির তাঁর হাত দিয়ে সেটি খাড়া করে দিলেন। মূসা (আ) বললেন, ‘আপনি ইচ্ছে করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রগন করতে পারতেন।’ তিনি বললেন, ‘এখানেই তোমার আর আমার সম্পর্কের অবসান।’ নবী বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলা মূসার ওপর রহম করুন। আমাদের কতই না মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হতো যদি তিনি সবর করতেন, তাহলে আমাদের কাছে তাঁদের আরো ঘটনাবলী বর্ণনা করা হতো।

মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ আলী ইবন খাসরাম সুফিয়ান ইবন উয়ায়না (র) এ হাদিসটি বিশদভাবে বর্ণনা করেন।

হাদিস ১২৫
উসমান (র)… আবূ মূসা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি নবী করীম – এর কাছে এসে বলল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কোনটি, কেননা আমাদের কেউ লড়াই করে রাগের বশীভূত হয়ে, আবার কেউ লড়াই করে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য। তিনি তার দিকে মাথা তুলে তাকালেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর মাথা তোলার কারণ ছিল যে, সে ছিল দাঁড়ানো। এরপর তিনি বললেনঃ আল্লাহর দীনকে বুলন্দ করার জন্য যে যুদ্ধ করে সেই আল্লাহর রাস্তায়।’

হাদিস ১২৬
আবূ নু‘আয়ম (র)… ‘আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি নবী করীম কে দেখলাম, জামরার নিকট তাঁকে মাস‘আলা জিজ্ঞাসা করা হছে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কংকর মারার আগেই কুরবানী করে ফেলেছি।’ তিনি বললেনঃ কংকর মার, তাতে কোন ক্ষতি নেই।’ অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কুরবানী করার পূর্বেই মাথা মুড়ে ফেলেছি।’ তিনি বললেনঃ কুরবানী করে নাও, কোন ক্ষতি নেই।’ বস্তুত আগে পিছু করার যে কোন প্রশ্নই তাঁকে করা হচ্ছিল, তিনি বলছিলেনঃ ‘কর, কোন ক্ষতি নেই।’

হাদিস ১২৭
কায়স ইবন হাফস (র)…‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার আমি নবী করীম – এর সঙ্গে মদীনার বসতিহীন এলাকা দিয়ে চলছিলাম। তিনি একখানি খেজুরের ডালে ভর দিয়ে একদল ইয়াহুদীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা একজন অন্যজনকে বলতে লাগল, ‘তাঁকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর।’ আর একজন বলল, ‘তাঁকে কোন প্রশ্ন করো না, হয়ত এমন কোন জওয়াব দিবেন যা তোমার পছন্দ করো না।’ আবার তাদের কেউ কেউ বলল, ‘তাঁকে আমরা প্রশ্ন করবই।’ তারপর তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে আবুল কাসিম রূহ কী?’ রাসূলুল্লাহ চুপ করে রইলেন, আমি মনে মনে বললাম, তাঁর প্রতি ওহী নাযিল হচ্ছে। তাই আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর যখন সে অবস্থা কেটে গেল তখন তিনি বললেনঃ

“তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত। এবং তাদেরকে সামান্যি জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” (১৭ঃ৮৫) আ‘মাশ (র) বলেন, এভাবেই আয়াতটিকে আমাদের কিরাআতে (…) –এর স্থলে (…) পড়া হয়েছে।

হাদিস ১২৮
উবায়দুল্লাহ ইবন মূসা (র)… আসওয়াদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ ইবনু যুবায়র (রা) আমাকে বললেন, ‘আয়িশা (রা) তোমাকে অনেক গোপন কথা বলতেন। বল তো কা‘বা সম্পর্কে তোমাকে কী বলেছেন? আমি বললাম, তিনি আমাকে বলেছেন, নবী করীম বলেছেনঃ ‘আয়িশা! তোমাদের কওম যদি (ইসলাম গ্রহণে) নতুন না হত, ইবন যুবায়র বলেনঃ কুফর থেকে; তবে আমি কা‘বা ভেঙ্গে ফেলে তার দুটি দরজা বানাতাম। এক দরজা দিয়ে লোক প্রবেশ করত আর এক দরজা দিয়ে বের হত। (পরবর্তীকালে মক্কার আধিপত্য পেলে) তিনি এরূপ করেছিলেন।

হাদিস ১২৯
পরিচ্ছেদঃ বুঝতে না পারার আশংকায় ইল্‌ম শিক্ষায় কোন এক কওম বাদ দিয়ে আর এক কওম বেছে নেওয়া।

আলী (রা) বলেন, ‘মানুষের কাছে সেই ধরনের কথা বল, যা তারা বুঝতে পারে। তোমরা কি পছন্দ কর যে, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হোক?

এ হাদীস উবায়দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন মূসা (র)…আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন।

হাদিস ১৩০
ইসহাক ইবন ইবরাহীম (র)… আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার মু‘আয (রা) নবী –এর পিছনে সাওয়ারীতে উপবিষ্ট ছিলান, তখন তিনি তাঁকে ডাকলেন, হে মু‘আয ইবন জাবাল! মু‘আয (রা) উত্তর দিলেন, ‘আমি হাযির ইয়া রাসূলাল্লাহ এবং (আপনার আদেশ পালানের জন্য) প্রস্তুত। তিনি ডাকলেন, মু‘আয! মু‘আয (রা) উত্তর দিলেন, ‘আমি হাযির ইয়া রাসূলাল্লাহ এবং প্রস্তুত।’ তিনি আবার ডাকলেন, মু‘আয। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি হাযির ইয়া রাসূলাল্লাহ এবং প্রস্তুত। এরূপ তিনবার করলেন। এরপর বললেনঃ যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল’… তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম হারাম করে দেবেন। মু‘আয (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি মানুষকে এ খবর দেব না, যাতে তারা সুসংবাদ পেতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে বসে থাকবে।’ মু‘আয (রা) (জীবনভর এ হাদিসটি বর্ণনা করেন নি) মৃত্যুর সময় এ হাদিসটি বর্ণনা করে গেছেন যাতে (ইলম গোপন রাখার) গুনাহ না হয়।

হাদিস ১৩১
মুসাদ্দাদ (র)…আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নবী করীম মু‘আয (রা) কে বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোনরূপ শিরক না করে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে দাখিল হবে। (এ কথা শুনে) মু‘আয (রা) বললেন, ‘আমি কি লোকদের সুসংবাদ দেব না?’ তিনি বললেন, ‘না, আমার আশংকা হচ্ছে যে, তারা এর উপরই ভরসা করে বসে থাকবে।’

হাদিস ১৩২
মুহাম্মদ ইবন সালাম (র)… উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর খিদমতে উম্মে সুলায়ম (রা) এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে? নবী বললেনঃ ‘হ্যাঁ, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।’ তখন উম্মে সালমা (লজ্জায়) তাঁর মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হয় কি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক! ১ (তা না হলে) তাঁর সন্তান তাঁর আকৃতি পায় কিরূপে?’

হাদিস ১৩৩
ইসমা‘ঈল (র)…ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলাল্লাহ বলেনঃ গাছের মধ্যে এমন এক গাছ আছে যার পাতা ঝরে পড়ে না এবং তা হ’ল মুসলিমের দৃষ্টান্ত। তোমরা আমাকে বল তো সেটা কোন গাছ? তখন লোকজনের খেয়াল জঙ্গলের গাছপালার প্রতি গেল। আর আমরা মনে হতে লাগল যে, তা হ’ল খেজুর গাছ। আবদুল্লাহ (রা) বলেন, ‘কিন্তু আমি লজ্জাবোধ করলাম।’ সাহাবায়ে কিরাম (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিই আমাদের তা বলে দিন।’ রাসূলাল্লাহ বললেনঃ ‘তা হ’ল খেজুর গাছ।’ আবদুল্লাহ (রা) বলেন, ‘তারপর আমি আমার পিতাকে আমার মনে যা এসেছিল তা বললাম।’ তিনি বললেন ‘তুমি তখন তা বলে দিলে অমুক অমুক জিনিস লাভ করার চাইতে আমি বেশী খুশী হতাম।’

হাদিস ১৩৪
মুসাদ্দাদ (র)… ‘আলী ইবন আবী তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমার অধিক পরিমাণে ‘মযী’ বের হত। তাই এ ব্যাপারে নবী – কে জিজ্ঞাসা করার জন্য মিকদাদকে বললাম। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন। রাসূলাল্লাহ বললেনঃ ‘এতে কেবল ওযূ করতে হয়।’

হাদিস ১৩৫
কুতায়বা ইবন সা‘ঈদ (র)… আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি মসজিদে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের কোথা থেকে ইহরাম বাঁধার নির্দেশ দেন?’ রাসূলাল্লাহ বললেনঃ মদীনাবাসী ইহরাম বাঁধবে ‘যু’ল-হুলায়কা’ থেকে, সিরিয়াবাসী, ইহরাম বাঁধবে ‘জুহফা’ থেকে এবং নাজদবাসী ইহরাম বাঁধবে ‘করন’ থেকে। ইবন উমর (রা) বলেন, অন্যরা বলেন যে, রাসূলাল্লাহ এও বলেছেনঃ ‘এবং ইয়ামানবাসী ইহরাম বাঁধবে ‘ইয়ালামলাম’ থেকে।’ ইবন ‘উমার (রা) বলেছেন, ‘এ কথাটি আমি রাসূলাল্লাহ থেকে বুঝে নিতে পারিনি।’

হাদিস ১৩৬
আদম (র)… ইবন ‘উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মুহরিম কী কাপড় পরবে?’ তিনি বলেনঃ ‘জামা পরবে না, পাগড়ী পরবে না, পাজামা পরবে না, টুপি পরবে না এবং কুসুম বা যা‘ফরান রঙ্গে রঞ্জিত কোন কাপড় পরবে না। জুতা না থাকলে চামড়ার মোজা পরতে পারে, তবে এমনভাবে কেটে ফেলতে হবে যাতে মোজ দু’টি পায়ের গিরার নিচে থাকে।