শ্রীমদ্ভাগবত গীতা - সপ্তম অধ্যায় (বাংলা অনুবাদ) - সেরা-সংগ্রহ.কম
X

Monday, June 13, 2016

শ্রীমদ্ভাগবত গীতা - সপ্তম অধ্যায় (বাংলা অনুবাদ)

শ্রীমদ্ভাগবত গীতা

সপ্তম অধ্যায়

( বাংলা অনুবাদ )




শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - হে পার্থ, তুমি আমাতে আসক্তচিত্ত এবং একমাত্র আমার শরণাপন্ন হইয়া যোগযুক্ত হইলে যেরূপে আমার সর্ববিভূতিসম্পন্ন সমগ্র স্বরূপ নিঃসংশয়ে জানিতে পারিবে তাহা শ্রবণ কর । ১


আমি তোমাকে বিজ্ঞানসহ মৎস্বরূপ-বিষয়ক জ্ঞান বিশেষরূপে বলিতেছি । উহা জানিলে শ্রেয়োমার্গে পুনরায় জানিবার আর কিছু অবশিষ্ট থাকিবে না । ২


সহস্র সহস্র মনুষ্যের মধ্যে হয়ত একজন মদ্বিষয়ক জ্ঞান লাভের জন্য যত্ন করে । আবার, যাঁহারা যত্ন করিয়া সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন মনে করেন, তাঁহাদিগেরও সহস্রের মধ্যে হয়ত একজন আমার প্রকৃত স্বরূপ জানিতে পারেন । ৩


ক্ষিতি, অপ্‌ (জল), তেজ, মরুৎ (বায়ু), ব্যোম (আকাশ), মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, এইরূপে আমার প্রকৃতি অষ্টভাগে ভেদ প্রাপ্ত হইয়াছে । ৪


এই পূর্বোক্ত অষ্টবিধা প্রকৃতি আমার অপরা প্রকৃত । ইহা ভিন্ন জীবরূপ চেতনাত্মিকা আমার পরা প্রকৃত আছে জানিও; হে মহাবাহো, সেই পরা প্রকৃতদ্বারা জগৎ বিধৃত রহিয়াছে । ৫


সমস্ত ভূত এই দুই প্রকৃত হইতে জাত, ইহা জানিও । সুতরাং আমিই নিখিল জগতের উৎপত্তি ও লয়ের কারণ । (সুতরাং আমি প্রকৃতপক্ষে জগতের কারণ) । ৬


হে ধনঞ্জয়, আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পরমার্থ-তত্ত্ব অন্য কিছুই নাই; সূত্রে মণি-সমূহের ন্যায় সর্বভূতের অধিষ্ঠানস্বরূপ আমাতে এই সমস্ত জগৎ রহিয়াছে । ৭


হে কৌন্তেয়, জলে আমি রস, শশিসূর্য্যে আমি প্রভা, সর্ববেদে আমি ওঙ্কার, আকাশে আমি শব্দ, মনুষ্য মধ্যে আমি পৌরুষরূপে বিদ্যমান আছি । ৮


আমি পৃথিবীতে পবিত্র গন্ধ, অগ্নিতে তেজ, সর্বভূতে জীবন এবং তপস্বীদগের তপঃস্বরূপ । ৯


হে পার্থ, আমাকে সর্বভূতের সনাতন বীজ বলিয়া জানিও । আমি বুদ্ধিমান্‌দিগের বুদ্ধি এবং তেজস্বিগণের তেজঃস্বরূপ । ১০

[ads-post]

হে ভরতর্ষভ, আমিই বলবান্‌দিগের কামরাগরহিত বল (অর্থাৎ স্বধর্মানুষ্ঠান সমর্থ সাত্ত্বিক বল) এবং প্রাণিগণের ধর্মের অবিরোধী কাম (অর্থাৎ দেহ ধারণাদির উপযোগী শাস্ত্রানুমত বিষয়াভিলাষ) । ১১


শমদমাদি সাত্ত্বিক ভাব, হর্ষদর্পলোভাদি রাজসিক ভাব, শোকমোহাদি তামসিক ভাব, এই সকলই আমা হইতে জাত । কিন্তু আমি সে সকলে অবস্থিত নহি (অর্থাৎ জীবের ন্যায় সেই সকলের অধীন নহি), কিন্তু সে সকল আমাতে আছে (অর্থাৎ তাহারা আমার অধীন) । ১২


এই ত্রিবিধ গুণময় ভাবের দ্বারা (সত্ত্বরজস্তমোগুণ দ্বারা) সমস্ত জগৎ মোহিত হইয়া রহিয়াছে, এ-সকলের অতীত অক্ষয় আনন্দস্বরূপ আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে পারে না । ১৩


এই ত্রিগুণাত্মিকা অলৌকিকী আমার মায়া নিতান্ত দুস্তরা । যাহারা একমাত্র আমারই শরণাগত হইয়া ভজনা করেন, তাহারাই কেবল এই সুদুস্তরা মায়া উত্তীর্ণ হইতে পারেন । ১৪


পাপকর্মপরায়ণ, বিবেকশূন্য নরাধমগণ মায়াদ্বারা হতজ্ঞান হইয়া আসুর স্বভাব প্রাপ্ত হওয়ায় আমাকে ভজনা করে না । ১৫


হে ভরতর্ষভ, হে অর্জুন, যে সকল সুকৃতিশালী ব্যক্তি আমাকে ভজনা করেন, তাহারা চতুর্বিধ - আর্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থাথী এবং জ্ঞানী । ১৬


ইহাদিগের মধ্যে জ্ঞানী ভক্তই শ্রেষ্ঠ । তিনি সতত আমাতেই যুক্তচিত্ত এবং একমাত্র আমাতেই ভক্তিমান্‌ । আমি জ্ঞানীর অত্যন্ত প্রিয় এবং তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয় । ১৭


ইহারা সকলেই মহান্‌ । কিন্তু জ্ঞানী আমার আত্মস্বরূপ, ইহাই আমার মত; যেহেতু মদেকচিত্ত সেই জ্ঞানী সর্বোৎকৃষ্ট গতি যে আমি সেই আমাকেই আশ্রয় করিয়া থাকেন । ১৮


জ্ঞানী ভক্ত অনেক জন্মের পর “বাসুদেবই সমস্ত” এইরূপ জ্ঞান লাভ করিয়া আমাকে প্রাপ্ত হন; এইরূপ মহাত্মা অতি দুর্লভ । ১৯


(স্ত্রীপুত্র ধনমানাদি বিবিধ) কামনাদ্বারা যাহাদের বিবেক অপহৃত হইয়াছে, তাহারা নিজ নিজ কামনা-কলুষিত স্বভাবের বশীভূত হইয়া ক্ষুদ্র দেবতাদের আরাধনায় ব্রতোপবাসাদি যে সকল নিয়ম আছে তাহা পালন করিয়া অন্য দেবতার ভজনা করিয়া থাকে । (আমার ভজনা করে না) । ২০


যে যে সকাম ব্যক্তি ভক্তিযুক্ত হইয়া শ্রদ্ধাসহকারে যে যে দেবমূর্তি অর্চনা করিতে ইচ্ছা করে, আমি (অন্তর্যামিরূপে) সেই সকল ভক্তের সেই সেই দেবমূর্তিতে ভক্তি অচলা করিয়া দেই । ২১


সেই দেবোপাসক মৎবিহিত শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া সেই দেবমূর্তির অর্চনা করিয়া থাকে এবং সেই দেবতার নিকট হইতে নিজ কাম্যবস্তু লাভ করিয়া থাকে, সেই সকল আমাকর্তৃকই বিহিত (কেননা সেই সকল দেবতা আমারই অঙ্গস্বরূপ) । ২২


কিন্তু অল্পবুদ্ধি সেই দেবোপাসকগণের আরাধনালব্ধ ফল বিনাশশীল; দেবোপাসকগণ দেবলোক প্রাপ্ত হন, আর আমার ভক্তগণ আমাকেই লাভ করিয়া থাকেন । ২৩


অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ আমার নিত্য সর্বোৎকৃষ্ট পরম স্বরূপ জানায় অব্যক্ত আমাকে প্রাকৃত ব্যক্তিভাবাপন্ন মনে করে । ২৪


আমি যোগমায়ায় সমাচ্ছন্ন থাকায় সকলের নিকট প্রকাশিত হই না । অতএব মূঢ় এই সকল লোক জন্মমরণরহিত আমাকে পরমেশ্বর বলিয়া জানিতে পারে না । ২৫


হে অর্জুন, আমি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সমস্ত পদার্থকে জানি; কিন্তু আমাকে কেহই জানে না । ২৬


হে ভারত, হে পরন্তপ, সৃষ্টিকালে অর্থাৎ স্থূলদেহ উৎপন্ন হইলেই প্রাণিগণ রাগদ্বেষজনিত সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্ব কর্তৃক মোহ প্রাপ্ত হইয়া হতজ্ঞান হয় (সুতরাং আমাকে জানিতে পারে না) । ২৭


কিন্তু পুণ্যকর্ম দ্বারা যাহাদের পাপ বিনষ্ট হইয়াছে, সেই সকল দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্ত ধীরব্রত ব্যক্তি আমাকে ভজনা করিয়া থাকেন । ২৮


যাহারা আমাতে চিত্ত সমাহিত করিয়া জরামরণ হইতে মুক্তি লাভের জন্য যত্ন করেন, তাহারা সেই সনাতন ব্রহ্ম, সমগ্র অধ্যাত্মবিষয় এবং সমস্ত কর্মতত্ত্ব অবগত হন । ২৯


যাহারা অধিভূত, অধিদৈব এবং অধিযজ্ঞের সহিত আমাকে (অর্থাৎ আমার এই সকল বিভিন্ন বিভাবসহ সমগ্র আমাকে) জানেন, সেই সকল ব্যক্তি আমাতে আসক্তচিত্ত হওয়ায় মৃত্যুকালে আমাকে জানিতে পারেন । মরণকালে মূর্চ্ছিত হইয়াও আমাকে বিস্মৃত হন না । (সুতরাং মদ্ভক্তগণের মুক্তিলাভের কোন বিঘ্ন নাই) । ৩০