শ্রীমদ্ভাগবত গীতা - চতুর্দশ অধ্যায় (বাংলা অনুবাদ) Geeta- 14 - সেরা-সংগ্রহ.কম
X

Sunday, June 26, 2016

শ্রীমদ্ভাগবত গীতা - চতুর্দশ অধ্যায় (বাংলা অনুবাদ) Geeta- 14

শ্রীমদ্ভাগবত গীতা

চতুর্দশ অধ্যায়

(বাংলা অনুবাদ)


সূচীপত্র

 শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - আমি পুনরায় জ্ঞানসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম জ্ঞান বলিতেছি, যাহা জানিয়া মুনিগণ এই দেহবন্ধন হইতে মোক্ষলাভ করিয়াছেন । ১

এই জ্ঞান আশ্রয় করিয়া যাঁহারা আমার সাধর্ম্য লাভ করেন অর্থাৎ ত্রিগুণাতীত অবস্থা প্রাপ্ত হন, তাঁহারা সৃষ্টিকালেও জন্মগ্রহণ করেন না, প্রলয়কালেও ব্যথিত হন না (অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু অতিক্রম করেন) । ২

হে ভারত, প্রকৃতিই আমার গর্ভাধান-স্থান । আমি তাহাতে গর্ভাধান করি, তাহা হইতেই সর্বভূতের উৎপত্তি হয় । ৩

হে কৌন্তেয়, দেব-মনুষ্যাদি বিভিন্ন যোনিতে যে সকল শরীর উৎপন্ন হয়, প্রকৃতি তাহাদের মাতৃস্থানীয়া এবং আমিই গর্ভাধানকর্তা পিতা । ৪

হে মহাবাহো, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ প্রকৃতিজাত এই তিন গুণ দেহমধ্যে অব্যয় আত্মাকে বন্ধন করিয়া রাখে । ৫

হে অনঘ, এই তিন গুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ নির্মল বলিয়া প্রকাশক এবং নির্দোষ; এই সত্ত্বগুণ সুখসঙ্গ ও জ্ঞানসঙ্গদ্বারা আত্মাকে বন্ধন করিয়া রাখে । ৬

হে অর্জুন, রজোগুণ রাগাত্মক, তৃষ্ণা ও আসক্তি উহা হইতে উৎপন্ন হয় । উহা কর্মাসক্তিদ্বারা দেহীকে বন্ধন করে । ৭

হে ভারত, তমোগুণ অজ্ঞানজাত এবং দেহিগণের ভ্রান্তিজনক । ইহা প্রমাদ (অনবধানতা), আলস্য ও নিদ্রা (চিত্তের অবসাদ) দ্বারা জীবকে আবদ্ধ করে । ৮

হে ভারত, সত্ত্বগুণ সুখে এবং রজোগুণ কর্মে জীবকে আসক্ত করে । কিন্তু তমোগুণ জ্ঞানকে আবৃত করিয়া প্রমাদ (কর্তব্যমূঢ়তা বা অনবধানতা) উৎপন্ন করে । ৯

হে ভারত, সত্ত্বগুণ রজঃ ও তমোগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয়, রজোগুণ তমঃ ও সত্ত্বগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয় এব তমোগুণ রজঃ ও সত্ত্বগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয় । ১০

[ads-post]

যখনই এই দেহে শ্রোত্রাদি সর্ব ইন্দ্রিয়দ্বারে জ্ঞানাত্মক প্রকাশ অর্থাৎ নির্মল জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তখন জানিবে যে, সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে । ১১

হে ভরতশ্রেষ্ঠ, লোভ, সর্বদা কর্মে প্রবৃত্তি এবং সর্ব কর্মে উদ্যম (সর্বদা ইহা করিব উহা করিব - এইরূপ অস্থিরতা), শান্তি ও তৃপ্তির অভাব, বিষয়স্পৃহা - এইসকল লক্ষণ রজোগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইলে উৎপন্ন হয় । ১২

হে কুরুনন্দন, তমোগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে বিবেকভ্রংশ, নিরুদ্যমতা, কর্তব্যের বিস্মরণ এবং মোহ বা বুদ্ধি-বিপর্যয় - এইসকল লক্ষণ উৎপন্ন হয় । ১৩

সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে যদি জীবের মৃত্যু হয়, তবে তিনি উত্তম তত্ত্ববিদ্‌গণের প্রাপ্য প্রকাশময় দিব্য লোকসকল প্রাপ্ত হন । ১৪

রজোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হইলে কর্মাসক্ত মনুষ্য-যোনিতে জন্ম হয় এবং তমোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হইলে পশ্বাদি মূঢ়-যোনিতে জন্ম হয় । ১৫

সাত্ত্বিক পুণ্য কর্মের ফল নির্মল সুখ, রাজসিক কর্মের ফল দুঃখ এবং তামসিক কর্মের ফল অজ্ঞান, তত্ত্বদর্শিগণ এইরূপ বলিয়া থাকেন । ১৬

সত্ত্বগুণ হইতে জ্ঞান উৎপন্ন হয়; রজোগুণ হইতে লোভ এবং তমোগুণ হইতে অজ্ঞান, প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হইয়া থাকে । ১৭

সত্ত্বগুণপ্রধান ব্যক্তি ঊর্ধ্বলোকে অর্থাৎ স্বর্গাদি লোকে গমন করেন; রজঃপ্রধান ব্যক্তিগণ মধ্যলোকে অর্থাৎ ভূলোকে অবস্থান করেন; এবং প্রমাদ-মোহাদি নিকৃষ্টগুণসম্পন্ন তমঃপ্রধান ব্যক্তিগণ অধোগামী হয় (তমিস্রাদি নরক বা পশ্বাদি যোনি প্রাপ্ত হয়) । ১৮

যখন দ্রষ্টা জীব গুণ ভিন্ন অন্য কাহাকেও কর্তা না দেখেন (অর্থাৎ প্রকৃতিই কর্ম করে, আমি করি না, ইহা বুঝিতে পারেন) এবং তিন গুণের অতীত পরম বস্তুকে অর্থাৎ আত্মাকে জ্ঞাত হন, তখন তিনি আমার ভাব অর্থাৎ ব্রহ্মভাব বা ত্রিগুণাতীত প্রাপ্ত হন । ১৯

জীব দেহোৎপত্তির কারণভূত এই তিন গুণ অতিক্রম করিয়া জন্মমৃত্যু জরাদুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া অমৃতত্ত্ব অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করেন । ২০

অর্জুন কহিলেন - হে প্রভো, কোন্‌ লক্ষণের দ্বারা জানা যায় যে জীব ত্রিগুণ অতিক্রম করিয়াছেন ? তাঁহার আচার কিরূপ ? এবং কি প্রকারে তিনি ত্রিগুণ অতিক্রম করেন ? ২১

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - হে পাণ্ডব, সত্ত্বগুণের কার্য প্রকাশ বা জ্ঞান, রজোগুণের ধর্ম কর্ম-প্রবৃত্তি এবং তমোগুণের ধর্ম মোহ, এই সকল গুণধর্ম প্রবৃত্ত হইলেও যিনি সুখবুদ্ধিতে উহা আকাঙ্ক্ষা করেন না, তিনিই গুণাতীত বলিয়া উক্ত হন । ২২

যিনি উদাসীনের ন্যায় সাক্ষিরূপে অবস্থান করেন, সত্ত্বাদিগুণ-কার্য সুখদুঃখাদি কর্তৃক বিচালিত হন না, গুণসকল স্ব স্ব কার্যে বর্তমান আছে, আমার সহিত ইহার কোন সম্পর্ক নাই, ইহা মনে করিয়া যিনি চঞ্চল হন না, তিনি গুণাতীত বলিয়া কথিত হন । ২৩

যাঁহার নিকট সুখদুঃখ সমান, যিনি স্বস্থ অর্থাৎ আত্মরূপেই স্থিত, মৃত্তিকা, প্রস্তর ও সুবর্ণ যাঁহার নিকট সমান, যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় এবং আপনার নিন্দা ও প্রশংসা তুল্য মনে করেন, যিনি ধীমান্‌ বা ধৈর্যযুক্ত, তিনিই গুণাতীত বলিয়া অভিহিত হন । ২৪

মানে ও অপমানে, শত্রুপক্ষ ও মিত্রপক্ষে যাঁহার তুল্যজ্ঞান এবং ফলাকাঙ্ক্ষা করিয়া যিনি কর্মোদ্যম করেন না (সর্বারম্ভপরিত্যাগী), এরূপ ব্যক্তি গুণাতীত বলিয়া কথিত হন । ২৫

যিনি ঐকান্তিক ভক্তিযোগ সহকারে আমার সেবা করেন, তিনি এই তিন গুণ অতিক্রম করিয়া ব্রহ্মভাব লাভে সমর্থ হন । ২৬

যেহেতু আমি ব্রহ্মের নিত্য অমৃতের অর্থাৎ মোক্ষের, সনাতন ধর্মের এবং ঐকান্তিক সুখের প্রতিষ্ঠা (অথবা আমি অমৃত ও অব্যয় ব্রহ্মের, শাশ্বত ধর্মের এবং ঐকান্তিক সুখের প্রতিষ্ঠা) । ২৭

Post Top Ad


Download

click to begin

6.0MB .pdf