(সংকেত: ভূমিকা; ভাইরাস ও এইচআইভি ভাইরাস; এইডস; এইডস-এর ইতিহাস; এইডস ভাইরাসের বিস্তার ও কারণ; বিশ্বব্যাপী এইডস-এর বিস্তার; এইডস ও এশিয়া; এইডস ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত; এইডস এর লক্ষণসমূহ; এইডস প্রতিরোধে করণীয়; এইডস প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রম; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ সারাবিশ্ব যেখানে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি আন্দোলনে উদ্বেলিত, এইডস নামক ভয়ানক মারাত্মক ব্যাধির উপস্থিতি সেখানে সভ্যতার গতিরোধক। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই আজ এইডস-এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। সবাই জানে এইডস এর ফলাফল মৃত্যু, কিন্তু এর কারণ সম্পর্কে সমাজে নানা রকম মত প্রচলিত। এর অধিকাংশ মতই ভ্রান্ত অর্থাৎ এইডস সম্পর্কে সমাজে প্রচুর ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান। এসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি একান্ত আবশ্যক, যা একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। এইডস এমন এক দূরারোগ্য ব্যাধি, যার প্রতিরোধ আছে কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই।

ভাইরাস (Virus) ও এইচআইভি (HIV)ভাইরাসঃ ভাইরাস নিউক্লিক প্রোটিন দ্বারা গঠিত, অকোষীয় রোগ সৃষ্টিকারী, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এক ধরণের জীবাণু, যা কিনা সুনির্দিষ্ট পোষক কোষে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে কেবল সেখানেই বংশ বিস্তার করতে সক্ষম। মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর, এমন কিছু ভাইরাস রোগের নাম হলোÑ ইনফ্লুয়েঞ্জা, পোলিও, এইডস, ক্যান্সার, হার্পিস, বসন্ত, হাম, ভাইরাল হেপাটাইটিস ইত্যাদি। এইডস রোগের জীবাণু বা ভাইরাসের নাম হলো এইচআইভি (HIV) ভাইরাস। HIV এমন এক ধরণের রেট্রো (Retro) ভাইরাস যা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উপায়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। HIV-এর পূর্ণরূপ হলো Human Immune Deficiency Virus পৃথিবীতে দুই ধরণের এইচআইভি পাওয়া গেছে। এগুলো হলো - HIV1, HIV2|

এইডস (AIDS): এইডস এর পূর্ণরূপ হলো Acquired Immune Deficiency Syndrome| এটি একটি ঘাতক ব্যাধি, যা এইচআইভি (HIV) থেকে জন্ম নেয় এই ভাইরাস দেহের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। HIV অন্যান্য সব ভাইরাসের মতোই, কিন্তু এর কার্যপদ্ধতি ভিন্ন।

এইডস (AIDS)-এর ইতিহাসঃ HIV আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথম সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৫৯ সালে ব্রিটেনে। সত্তর এর দশকে আফ্রিকায় এইডস ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালে আমেরিকা এবং ১৯৭৭-৭৮ সালে হাইতি, হাভানাসহ বিশ্বের অনেক স্থানে এইডস ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালেই প্রথম এইডসকে মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এই রোগের কারণসমূহও চিহ্নিত হয়। হলিউডের খ্যাতনামা অভিনেতা হাডসন ১৯৮৫ সালে যখন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তখন বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ১৯৮৫ সালেই মানব রক্তে এইডস ভাইরাস আছে কিনা তার পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়।

এইডস ভাইরাসের বিস্তার ও কারণঃ কিছু সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শরীরের চার ধরণের তরল পদার্থের মাধ্যমে এইডস ভাইরাস ছড়ায়। এগুলো হলো রক্ত, বীর্য, যোনিরস ও মাতৃদুগ্ধ। এই চারটি তরল পদার্থ যদি কোনো এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে কোনো সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে তবেই তিনি এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন।

HIV-তে আক্রান্ত হওয়ার কারণগুলো হলো-

এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অনিরাপদ যৌন মিলন।

এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সূচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার।

এইচআইভি বহনকারী মা এর মাধ্যমে তার গর্ভস্থ সন্তান, অথবা জন্মদানের সময় বা জন্মের পর দুগ্ধদানের মাধ্যমে সন্তান এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে।

রক্তদানের সময় দানকৃত ব্যক্তির এইচআইভি থাকলে তা গ্রহীতার রক্তে সঞ্চালনের মাধ্যমে গ্রহীতার এইচআইভি হতে পারে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তি যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য সরাসরি শরীরে প্রবেশ করায়, তাদের এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনিরাপদ যৌন মিলনের চেয়েও বেশি।

বিশ্বব্যাপী এইডস এর বিস্তারঃ UNAIDS ও WHO এর হিসাব অনুযায়ী ২০০৩ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে ৪০ মিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক ও শিশু ছিল যারা এইচআইভিতে আক্রান্ত। বর্তমানে নারী ও পুরুষ উভয়ক্ষেত্রেই সমানভাবে এইডস ছড়াচ্ছে। বিশ্বে এ পর্যন্ত মোট ৬ কোটির বেশি লোক এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, এইডস আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩.২ মিলিয়ন, এর মধ্যে ৩,৩০,০০০ জনই ছিল শিশু। আর বাকি ৩ কোটি ৩২ লাখ লোক আক্রান্ত হয়েই বেঁচে আছে।

এইডস ও এশিয়াঃ ২০০৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়াতে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি ও শিশু ছিল ৫.৮ মিলিয়ন। একই অঞ্চলে ২০০০ সালের হিসাব অনুযায়ী ৭,০০,০০০ জন এইচআইভি আক্রান্ত ছিল। এদের মধ্যে ৪,৫০,০০০ জন পুরুষ ও ২৫,০,০০০ জন মহিলা। বর্তমানে এ অঞ্চলে ৭২ লাখ লোক এইচআইভিতে আক্রান্ত। যার মধ্যে ২০০২ সালে ১০ লাখ বয়স্ক ও শিশু নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সর্বদিক বিচারে এশিয়ার বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়।
[ads-post]
এইডস ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিতঃ বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। এর পাশ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ভুটানে এইচআইভি সংক্রমণের হার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের সাথে এসব দেশের যোগাযোগ থাকার কারণে বাংলাদেশেও এইডস এর বিস্তার ঘটছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দুটো জেলা সিলেট ও চট্টগ্রামে এইডসে আক্রান্তের হার বেশি। এছাড়া সীমান্তবর্তী জেলা যশোর ও রাজশাহীতেও এই হার চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের জন্য এই ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি থাইল্যান্ডের মতো হুমকিস্বরূপ।

HIV-তে আক্রান্ত হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হলো যৌনকর্মীরা। এছাড়াও এদেশে ইনজেকশন-এর মাধ্যমে মাদক সেবনকারীরাও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের এইডস-এ আক্রান্ত হওয়ার কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হলো-

কিশোর ও তরুণ সমাজ যারা মাদক দ্রব্য সেবন করে।

অল্প বয়স্ক মহিলা ও মেয়ে শিশু, যাদের অধিকাংশ শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত।

নিজের পরিবার পরিজন ও সমাজ ছেড়ে আসা ভাসমান জনগোষ্ঠী, যারা প্রায়ই একাকিত্বের কারণে যৌন কর্মীদের সাথে যৌন মিলন করে থাকে।

মাদকসেবী জনগোষ্ঠী যারা অর্থের জন্য অনিরাপদ যৌন মিলনে বাধ্য হয়।

এইডস এর লক্ষণসমূহ : এইডস এর লক্ষণসমূহ নিম্নরুপ -

* মাঝে মাঝে জ্বর, মাথা ব্যথা ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস।

* মুখের ভেতর, ঠোঁটে ও জিভে সাদা পর্দা পড়া।

* অসীম দুর্বলতা ও হজম শক্তি হ্রাস।

* স্মৃতিশক্তি হ্রাস।

* শুকনা কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট।

* গ্রন্থিসমূহ বিশেষ করে গলা, বগল ও কুচকী ফুলে যাওয়া।

* রাতে ঘাম হওয়া, অনিদ্রা ও ওজন কমে যাওয়া।

* পিঠে, মুখে ও গলায় ফুসকুরি।

এইডস প্রতিরোধে করণীয়ঃ এইডস প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এইডস প্রতিরোধে করণীয়গুলো নিম্মরূপ-

প্রথমতঃ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।

দ্বিতীয়ঃ যৌন সম্পর্ক স্থাপনে নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করা। এছাড়া বহুগামীতা ও পতিতালয়ে যাতায়াত বন্ধ করা।

তৃতীয়তঃ রক্তদানের পূর্বে রক্তদাতার রক্তে HIV- আছে কিনা তা পরীক্ষা করা।

চতুর্থতঃ অন্যের সুই, সিরিঞ্জ, ব্লেড, রেজার, ক্ষুর ইত্যাদি ব্যবহার না করা।

পঞ্চমঃ এইডস আক্রান্ত মায়ের গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকা।

ষষ্ঠতঃ মাদক দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকা এবং সরকারি, বেসরকারি, দেশি, বিদেশি সকল প্রচার মাধ্যমে সতর্কতামূলক প্রচার চালানো।

এইডস প্রতিরোধে সমাজ সচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রমঃ এইডস প্রতিরোধে জীবনমুখী ও গণশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শিক্ষিত সমাজে সচেতনতা থাকলে, পুরো সামজকে সচেতন করে তোলা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি জীবনমুখী বা বাস্তবমুখী শিক্ষা দিতে পারে না। পাঠ্য পুস্তকে এইডস-এর সচেতনতামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভূক্ত করা দরকার। শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বর্তমানে নতুন এক দিগন্ত হলো জীবন দক্ষতামূলক শিক্ষা (LSE=Life Skill Education) এর মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে এইডস-এর মতো ভয়াবহ ব্যাধি মোকাবিলা করা সম্ভব।

উপসংহারঃ এইডস একটি ঘাতক ব্যধি। সারাবিশ্বে অতি দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়ছে। এখনো পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই ব্যাপক হারে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালাতে হবে। এই সচেতনতা কার্যক্রম ফলপ্রসু না হলে কিংবা প্রতিকার ব্যবস্থা না আসলে এটি মহামারীর আকার ধারণ করবে এবং পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। তাই এইডস প্রতিরোধে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।