(সংকেত: ভূমিকা; নাগরিকের সংজ্ঞা; সুনাগরিক; অধিকার ও কর্তব্য; নাগরিক অধিকার; নাগরিক কর্তব্য; সংবিধানে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য; সুনাগরিক হওয়ার উপায়; রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব; সুপারিশ; উপসংহার।)
আরও ১১৪ টি রচনা

ভূমিকা: প্রতিটি রাষ্ট্রেরই মূল্যবান সম্পদ হলো সৎ, যোগ্য ও নীতিবান নাগরিক। একটি রাষ্ট্রের কাঠামো এর নাগরিকের আচরণ ও প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রের অগ্রগতির জন্য অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন নাগরিকের প্রয়োজন। এজন্য অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জানা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। এগুলো সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান ও সচেতনতাই পারে একটি রাষ্ট্রকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে।

নাগরিকের সংজ্ঞা: সাধারণ কথায়, যারা নগরে বসবাস করেন তাদেরকে নাগরিক বলা হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে নাগরিকের ধারণাটি অনেক ব্যাপকতা লাভ করেছে। নাগরিক এখন শুধু নগরের বাসিন্দারাই নন। যারা একটি রাষ্ট্রে বাস করেন তারা সবাই সে দেশের নাগরিক। প্রাচীনকালে রাষ্ট্রগুলো নগরকেন্দ্রিক হওয়ায় নগরের বাসিন্দাদেরকেই শুধু নাগরিক বলে গণ্য করা হত। বর্তমানে নাগরিক হলেন নির্দিষ্ট ভূখন্ডের প্রতি আনুর্গত্য প্রদর্শকারী ব্যক্তি যিনি তার উপর আরোপিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন এবং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।

সুনাগরিক: রাষ্ট্র এবং মানবতার কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে সুনাগরিক বলে। সুনাগরিক প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান সম্পদ। সুনাগরিকের অনেকগুলো গুণ রয়েছে। এর মধ্যে বুদ্ধি, বিবেক, আত্মসংযম, জ্ঞান, সচেতনতা, সততা, ন্যায়বোধ অন্যতম। সুনাগরিক তার এসব গুণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সেবা করে এবং রাষ্ট্রকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে থাকে।

অধিকার ও কর্তব্য: অধিকার বলতে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতাকে বোঝায়। তবে অধিকার মানে স্বেচ্ছাচার নয়। অধিকার হচ্ছে অন্যের স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন না করে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতা। অপরদিকে, কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত বা স্বেচ্ছায় পালিত কতিপয় দায়িত্ব যা রাষ্ট্র ও জনগণের উপকারে আসে। অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে পার্থক্য হলো নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে তার অধিকারের দাবি করতে পারে। অপরদিকে রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে তার কর্তব্য পালনের দাবি করতে পারে।

নাগরিক অধিকার: নাগরিক বৈধ অধিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে যেসব সুযোগ-সুবিধা দাবি করতে পারে তাই হলো নাগরিক অধিকার। বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক লাস্কি বলেন, অধিকার হলো সমাজ জীবনের সে সকল অবস্থা (সুযোগ-সুবিধা) যা ছাড়া মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারে না। অধিকারের প্রাপ্যতার মাধ্যমে নাগরিক জীবনের বিকাশ সহজ হয়।

নাগরিক অধিকারকে প্রধানত দু ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১। নৈতিক অধিকার ও ২। আইনগত অধিকার। আইনগত অধিকারকে আবার তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ক) সামাজিক অধিকার, খ) রাজনৈতিক অধিকার, গ) অর্থনৈতিক অধিকার। নিচে নাগরিক অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

সামাজিক অধিকার: সমাজে সুষ্ঠুভাবে জীবন-যাপন করার জন্য নাগরিকের যেসব সুযোগ সুবিধা প্রয়োজন হয় তাই হচ্ছে সামাজিক অধিকার। নাগরিকের সামাজিক অধিকারগুলো হলোঃ- * জীবন ধারণের অধিকার * চলাফেরার অধিকার * সম্পত্তি ভোগের অধিকার * চুক্তি করার অধিকার * ধর্মীয় অধিকার * পরিবার গঠনের অধিকার * খ্যাতিলাভের অধিকার প্রভৃতি। এসব সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র নাগরিক জীবনের সুষ্ঠু বিকাশে সহায়তা করে থাকে।
[ads-post]
রাজনৈতিক অধিকার: রাজনৈতিক অধিকারের বিস্তৃতির উপর নাগরিকের রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের বিস্তৃতি নির্ভর করে। রাজনৈতিক অধিকার নাগরিকদের রাষ্ট্রের কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। যে রাষ্ট্র রাজনৈতিক অধিকার বেশি বিস্তৃত সে রাষ্ট্রে নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ বেশি। রাষ্ট্র নাগরিককের রাজনৈতিক অধিকার হলো- * নির্বাচনের অধিকার * আবেদন করার অধিকার * সরকারের সমালোচনা করার অধিকার * বিদেশে অবস্থান কালে নিরাপত্তা লাভের অধিকার * স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার ইত্যাদি। এসব অধিকারগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করে।

অর্থনেতিক অধিকার: নাগরিক জীবনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত জীবন যাপনের জন্য রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকারগুলোই হলো অর্থনৈতিক অধিকার। অর্থনৈতিক অধিকারগুলো হলো- * কর্মের অধিকার * ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকার * অবকাশ লাভের অধিকার * শ্রমিক সংগঠনের অধিকার প্রভৃতি। অর্থনৈতিক অধিকার নাগরিকের জীবনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করে। এ অধিকারের মাধ্যমে নাগরিক তার জীবনকে উন্নত জীবনের পথে চালিত করে।

নাগরিক কর্তব্য: নাগরিক রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার ভোগ করতে গিয়ে কিছু কাজে দায়বদ্ধ হয়ে যায়। নাগরিক কর্তৃক পালনীয় রাষ্ট্রের প্রতি এসব দায়িত্বকে কর্তব্য বলা হয়। কর্তব্য পালনের মাধ্যমে নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করে থাকে। নাগরিকের কর্তব্যগুলোকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১। নৈতিক কর্তব্য ২। আইনগত কর্তব্য। নাগরিক তার নীতিবোধে তাড়িত হয়ে যেসব কর্তব্য পালন করে নৈতিক কর্তব্য বলে। রাষ্ট্রের আইন-কানুন দ্বারা নির্ধারিত যেসব কর্তব্য নাগরিকের পালন করা অপরিহার্য তাকে আইনগত কর্তব্য বলে। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কর্তব্যগুলো হলো আইন মান্য করা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা, কর প্রদান, সন্তানদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করা, রাষ্ট্রের সেবা করা ইত্যাদি।

সংবিধানে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য: বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। একই সাথে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কর্তব্যের দিক-নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে যে, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ-শিশু নির্বেশেষে সকলেই সমান অধিকারের অধিকারী হবেন। এ ক্ষেত্রে ধর্ম-বর্ণ বা অন্যকোনো প্রতিবন্ধকতা নাগরিকের অধিকার আদায়ে বৈষম্যের সৃষ্টি করবে না। বাংলাদেশের সংবিধানে ২৬ নং থেকে ৪৭(ক) নং অনুচ্ছেদে নাগরিকের অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধিকারগুলো হলো- আইনের দৃষ্টিতে সমতা, সরকারি নিয়োগলাভে সুযোগের সমতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি।

সংবিধানের ২০ ও ২১ নং অনুচ্ছেদে নাগরিকের কর্তব্য পালন সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে উল্লেখিত নাগরিক কর্তব্যগুলো হলো- সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা, জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা ও সকল সময়ে জনগণের সেবার করার চেষ্টা করা। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। যার মাধ্যমে নাগরিক জীবনের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব।

সুনাগরিক হওয়ার উপায়: সুনাগরিক হওয়ার জন্য প্রথমেই একজন নাগরিককে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতার গুণ অর্জন করতে হবে। সুনাগরিকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো স্বদেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেম ছাড়া সুনাগরিক হওয়া যায় না। একজন সুনাগরিককে শুধু নিজের রাষ্ট্রের গন্ডির ভিতর আবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাকে হতে হবে বিশ্ব নাগরিক। সুনাগরিক হবেন ত্যাগ স্বীকারকারী। তিনি দেশ ও জাতির জন্য নিজের জীবনকে বাজী রাখতে তৈরি থাকবেন। সুনাগরিককে হতে হবে জ্ঞানী, দায়িত্ব সচেতন এবং সৎচরিত্রের অধিকারী। সুনাগরিকের এসব গুণ অর্জনের জন্য ছোটবেলা থেকেই ন্যায়পরায়নতা এবং দেশপ্রেমের শিক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে। নিজ সাধনা এবং সচেতন তদারকির মাধ্যমে একজন নাগরিক ভালো গুণগুলো অর্জন করবেন। এভাবেই একজন নাগরিক সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারবেন।

রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব: রাষ্ট্র যেমন নাগরিককে অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়েছে তেমনি এসব অধিকার ভোগ করতে গিয়ে নাগরিককে কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। অধিকার আদায় এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। নাগরিককে সবসময় রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীন উন্নতির জন্য সচেতন থাকতে হবে। একজন যোগ্য ও দায়িত্বশীল নাগরিক রাষ্ট্রের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য নাগরিককে সুশিক্ষিত, দায়িত্বশীল এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। নাগরিক তার মননে হবেন বিশ্ব নাগরিক। তবে তাকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। সংকীর্ণ দলাদলিকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য কাজ করতে হবে। নাগরিককে নৈতিকতার শক্তিতে বলিয়ান হয়ে সংকীর্ণতা পরিহার ও মুক্তমনা হতে হবে। সর্বোপরি নাগরিকের সকল কাজ-কর্মের উদ্দেশ্য হবে রাষ্ট্র ও এর নাগরিকদের কল্যাণ সাধন।

সুপারিশ: অনেক সময় দেখা যায় রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার খর্ব করে এবং নাগরিককে অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এছাড়াও দেখা যায় কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে নাগরিক নিজের অজ্ঞতা এবং উদাসীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত কর্তব্য পালনে সক্ষম হয় না। এজন্য অধিকার পরিপূর্ণভাবে আদায় এবং কর্তব্য পালনে নাগরিকদের সম্পৃক্ততার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

- অধিকারের বাস্তবায়নের জন্য কঠোর আইন তৈরি করা।

- নাগরিককে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।

- পাঠ্যপুস্তকে, মিডিয়া ইত্যাদি গণমাধ্যমে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে প্রচারণা চালানো।

- রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

- অধিকার ও কর্তব্যের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রকে সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে।

উপসংহার: পরিশেষে একথা বলা যায় যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এবং জনকল্যাণের জন্য নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। এজন্য রাষ্ট্রকে পূর্ণ দায়িত্বশীলতার সাথে তদারকের ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিককে যোগ্য, সৎ এবং সচেতন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই নাগরিক তার অধিকার আদায় এবং রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।