(সংকেত: ভূমিকা; সংবাদপত্রের উৎপত্তি ও বিকাশ; ভারতবর্ষে সংবাদপত্র; সংবাদপত্রের শ্রেণিভেদ; বাংলাদেশের সংবাদপত্র; বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা; সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা; সংবাদপত্রের স্বাধীনতা; সংবাদপত্রের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা; উপসংহার।)
আরও ১১৪ টি রচনা

ভূমিকা: সভ্যতার ক্রমবিকাশের সূত্র ধরে মানবজীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচনার উল্লেখযোগ্য উপকরণ হিসেবে সংবাদপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দৈনন্দিন জীবনের ঘটে যাওয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর প্রতিফলিত হয় সংবাদপত্রে। সংবাদপত্রের পরিধি কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জ্ঞানচর্চা, জনমত গঠন, রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থায়ও সংবাদপত্রের রয়েছে ইতিবাচক ভূমিকা। সংবাদপত্রকে বলা হয়ে থাকে সমাজের তথা গোটা বিশ্বের দর্পণ। যাতে ভেসে উঠে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার প্রতিবিম্ব। সংবাদপত্র আধুনিক সভ্য জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ।

উৎপত্তি ও বিকাশ: সংবাদপত্রের উৎপত্তির ইতিহাস সুস্পষ্ট না হলেও সংবাদপত্র উদ্ভাবনের কৃতিত্ব ও গৌরব বর্তায় মূলত চীনের উপর। চীন দেশেই প্রথম কাগজ ও মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল। ইউরোপ অঞ্চলে সংবাদপত্রের বিকাশ ঘটে ইতালির হাত ধরে। ইতালিতেই প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ইউরোপীয় সংবাদপত্র। সেখান থেকে সংবাদপত্র ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের কল্যাণে সংবাদপত্রের ত্বরিত প্রসার লাভের মাধ্যমে উন্মোচিত হয় মানব সভ্যতার এক নতুন অধ্যায়।

ভারতবর্ষে সংবাদপত্র: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুদ্রণশিল্পের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতবর্ষে সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়। আগাস্টাস হিকি’র সম্পাদনায় ১৭৮০ সালে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্রটির নাম ছিল “বেঙ্গল গেজেট”। পরে ইন্ডিয়া গেজেট, ক্যালকাটা গেজেট, প্রভৃতি ইংরেজি সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৮১৮ সালে এপ্রিল মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র ‘দিগদর্শন’। একই বছরের মে মাসে প্রকাশিত হয় বাংলাভাষার প্রথম সংবাদপত্র বলে বিবেচিত ‘সমাচার দর্পণ’। ১৮৩১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ প্রভাকর’। ইংরেজদের হাত ধরে ভারতবর্ষে সাংবাদিকতার ঐতিহ্য শুরু হলে বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়।

সংবাদপত্রের শ্রেণিভেদ: প্রকাশের বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে সংবাদপত্রকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যেমন

- দৈনিক: প্রতিদিন প্রকাশিত সংবাদপত্র।

- সাপ্তাহিক: প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত সংবাদপত্র।

- পাক্ষিক: প্রতি পনেরো দিন অন্তর প্রকাশিত সংবাদপত্র।

- মাসিক: প্রতি মাসে প্রকাশিত সংবাদপত্র।

- ত্রৈমাসিক: প্রতি তিনমাস অন্তর প্রকাশিত সংবাদপত্র।

- ষান্মাসিক: প্রতি ছয়মাস অন্তর প্রকাশিত সংবাদপত্র।

- বার্ষিক: প্রতি বছর প্রকাশিত সংবাদপত্র।
[ads-post]
বাংলাদেশের সংবাদপত্র: বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য জাতীয় দৈনিকগুলো হলো- দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক মানবজমিন, দৈনিক সমকাল, দৈনিক আমাদের সময়, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক দিনকাল, দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক যায় যায় দিন, দৈনিক মানবকণ্ঠ, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক ডেসটিনি, দৈনিক সকালের খবর প্রভৃতি। এছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক সাপ্তাহিক ও দৈনিক অনেক পত্রিকা রয়েছে। ইংরেজি পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দি ডেইলি স্টার, দি ইনডিপেনডেন্ট, নিউ এজ, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাদেশ টুডে, নিউজ টুডে, ঢাকা ট্রিবিউন, ডেইলি সান ইত্যাদি। এছাড়াও অনলাইনভিত্তিক বেশ কিছু পত্রিকা রয়েছে যেমন- বিডি নিউজ ২৪, নিউজ ২৪, পরিবর্তন, নতুনবার্তা, নিউজ ইভেন্ট ২৪, ঢাকা টাইমস ২৪, তাজা খবর, প্রেজেন্ট নিউজ বিডি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা: বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা হলো- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস। পাকিস্তান আমলে এর নাম ছিল (এপিপি) এসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান। এছাড়াও ইউএনবি, বিএনএ, ঢাকা কেন্দ্রীক গ্রোব বার্তা সংস্থা, মিডিয়া সিন্ডিকেট, নিউজ মিডিয়া, আবাস প্রভৃতি।

সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা: প্রাত্যহিক জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সংবাদপত্র আধুনিক সভ্যতার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। নিচে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো-

আধুনিক জীবনে সংবাদপত্র: বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় মানবজীবনের সাথে সংবাদপত্রের এত বেশি সখ্যতা যে সংবাদপত্র ছাড়া আধুনিক জনজীবন অচল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সংবাদপত্র না থাকলে বিশ্বের সঙ্গে ব্যক্তির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার সেতুবন্ধন হচ্ছে সংবাদপত্র। দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংবাদ পরিবেশন ছাড়াও সংবাদপত্রে থাকে বিচিত্র তথ্য-প্রতিবেদন। সর্বোপরি আধুনিক জীবনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

জনমত গঠনে সংবাদপত্র: বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধূলা সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে সংবাদপত্রের অবাধ বিচরণ। সংবাদপত্রের নির্ভীক বাণী যখন ধ্বনিত হয় তখন পৃথিবীর লক্ষ কোটি মানুষের কণ্ঠস্বরও সোচ্চার হয়ে উঠে। সংবাদপত্রের মাধ্যমেই জনগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সমাজজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়। সংবাদপত্র যুক্তি ও তথ্যনির্ভর আলোচনা প্রকাশ করে পাঠকের নিজস্ব অভিমত গঠনে ভূমিকা রাখে। সংবাদপত্র সরকারের জনকল্যাণকর পদক্ষেপকে সমর্থন ও গণবিরোধী নীতির সমালোচনার মাধ্যমে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জ্ঞানচর্চায় সংবাদপত্র: কথিত আছে 'Newspaper is the store-house of knowledge'. সংবাদপত্র বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রকেই তার আওতায় নিয়ে এসেছে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক আলোচনা, গবেষণা, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি জানা যায়। শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের জন্য সংবাদপত্রে থাকে আলাদা বিভাগ। কাজেই নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে বহুমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে জ্ঞানের ক্ষেত্র যেমন প্রসারিত হয় তেমনি বিষয়-জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষাগত জ্ঞানও বৃদ্ধি পায়। অতএব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

গণতন্ত্র ও সংবাদপত্র: সংবাদপত্রকে বলা হয়ে থাকে গণতন্ত্রের সদাজাগ্রত পাহারাদার। কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে, গণতন্ত্রের মর্যাদা ক্ষুন্ন হলে বা জনগণের অধিকার খর্ব হলে বেজে উঠে সংবাদপত্রের সাহসী প্রতিবাদের সুর। গণতন্ত্রকে অথপূর্ণ করার জন্য সংবাদপত্রের রয়েছে অবিরাম প্রচেষ্টা। বিশ্বে গণতন্ত্র চর্চায় সংবাদপত্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সঠিক তথ্য বিতরণ করে সমাজকে সর্বদা সজাগ রাখে সংবাদপত্র। এটি তাই জনগণের পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণের এক দায়িত্বশীল অভিভাবক।

রাজনীতি, সরকার ও সংবাদপত্র: রাজনীতি চর্চা ও সরকার ব্যবস্থায় রয়েছে সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রাজনৈতিক দল তার কর্মসূচি ও নীতি জনগণের সামনে উপস্থাপন করে সংবাদপত্রের মাধ্যমে। সরকারের সাথে জনগণের একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে সংবাদপত্র। সংবাদপত্রে জনগণের মতামত প্রতিধ্বনিত হয়ে সরকারের কানে পৌঁছায়। আবার সরকার ও জনগণের কাছে তার জনকল্যাণমূলক বার্তা প্রেরণ করে সংবাদপত্রের মাধ্যমে। কাজেই সংবাদপত্রকে পাশ কাটিয়ে কখনো রাজনীতি চর্চা হয় না। বিধায় একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার গঠনে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: ''The freedom of newspaper could preserve democracy constitutionalism and good governac''

- anthny Maskurenaus

সংবাদপত্র যেহেতু একটি সমাজের সামগ্রিক পরিচয়ের প্রাত্যহিক দলিল সেহেতু এটির নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বাঞ্চনীয়। সংবাদপত্রকে বলা হয় জনগণের স্বার্থ রক্ষার অতন্ত্র প্রহরী। জনগণের সামগ্রিক কল্যাণার্থে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে সংবাদপত্র। তাই সংবাদপত্রকে হতে হবে অকপট ও নির্ভীক। আর এর জন্য দরকার পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলো এখনো আশানুরূপ স্বাধীনতা লাভ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সর্বদা নিজেদের স্বার্থে সংবাদপত্রকে ব্যবহার করার হীন প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাদের আধিপত্য বিস্তারের এই অপচেষ্টা নিয়মিতভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করছে।

সংবাপত্রের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা: সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির মালিকানায়। কাজেই সংশ্লিষ্ট মহল এর উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়। তা ছাড়া মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বেশির ভাগ সংবাদপত্রই পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। ফলে জনস্বার্থ অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। কিছু কিছু সংবাদপত্র আবার রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে। এইসব ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। উপসংহার: সংবাদপত্র দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধ মানুষকে বিশ্বের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে উত্তীর্ণ করে দেয়। সংবাদপত্র হচ্ছে সভ্যতার অগ্রগতির প্রমাণপত্র এবং নির্যাতিতের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বর্তমান সভ্য সমাজে সংবাদপত্রের অনুপস্থিতি কল্পনা করা যায় না। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণের মঙ্গল সাধন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় সংবাদপত্রই রাখতে পারে বলিষ্ঠ ভূমিকা। দলীয় স্বার্থ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে সমাজজীবনে আধুনিক ধ্যান-ধারণা ও বিজ্ঞানমুখী চেতনার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা হবে আরো কল্যাণমুখী।