বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ নিঝুম দ্বীপ - সেরা-সংগ্রহ.কম
X

Thursday, February 2, 2017

বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ নিঝুম দ্বীপ

নিঝুম দ্বীপ



এখানে সমুদ্রের বুকে হেলে পড়ে অস্তগামী সূর্য, হাজার পাখির কলতান নিস্তব্দতার ঘুম ভাঙ্গায়, মায়াবী হরিনের পদচারনায় মুখরিত হয় জনপদ, সারি সারি কেওড়া গাছের কোল ঘেষে বয়ে চলে নদী, চুপিসারে কাছে ডাকে, মায়াবী ইন্দ্রজানে বেধে ফেলে মনুষ্যপ্রজাতীকে। সমুদ্রকোল হতে সরু খাল সবুজের বুক চিরে চলে গেছে গহীন বনে। সে যে সবুজ আর নোনা জলের কি এক প্রেমকাব্য না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে সমুদ্রের তলানী পর্যন্ত। স্বচ্ছ পানির নিচে সবুজ ঘাষ আর মাছেরা খেলা করে আপন খেয়ালে। দেখলেই মন চাইবে ঝাপিয়ে পড়ে পরাণ জুড়াই। এ এমনই এক মায়াবী প্রকৃতি যা শহুরে কর্মচঞ্চল মানুষক নতুন এক জীবন দেয়। নিঝুম দ্বীপ- সত্যিই নিঝুম। একবারই অলাদা। সব কিছুর বাহিরে। এখানে নেই পর্যটনের চাকচিক্য, রং চংগা বাতির ঝলক কিংবা যান্ত্রিক কোন বাহনের বিকট শব্দ। নিঝুম- সত্যিই নিঝুম, নিশ্চুপ। এ যেন প্রকৃতির একটি আলাদা সত্ত্বা। যা আর কোথাও নেই। বঙ্গোপসাগরের কোলে উত্তর ও পশ্চিমে মেঘনার শাখা নদী, আর দক্ষিণ এবং পূর্বে সৈকত ও সমুদ্র বালুচরবেষ্টিত ছোট্ট সবুজ ভূখণ্ড নিঝুম দ্বীপ—এখন পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান। নোয়াখালীর দক্ষিণে মূল হাতিয়া পেরিয়ে এ দ্বীপে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় প্রমত্তা মেঘনা। শীতে নদী শান্ত থাকে বলে প্রকৃতিকে ভিন্ন স্বাদে উপভোগ করতে ভ্রমণপিয়াসীরা ছুটে যায় নিঝুম দ্বীপে। চিত্রা হরিনের চঞ্চল ছুটে চলা আর পাখির কলতান উপভোগ করার জন্য যেন প্রকৃতি আমাদেরকে বিলিয়ে দিয়েছ এই সম্পদ। ৬০ হাজারের বেশি হরিণের ছুটোছুটিতে এ দ্বীপের অরণ্য থাকে সর্বদাই মুখরিত। যারা বনবাদাড় মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে সৈকত আর সমুদ্র বালুচর দেখতে আগ্রহী তাদের জন্য আরও আকর্ষণীয় এখন নিঝুম দ্বীপ। শীতের সময় শরীরকে একবার চাঙ্গা করে নিতে হলে এখন ঘুরে আসতেই হয় বঙ্গোপসাগরের চোখসদৃশ এ দ্বীপে।

লম্বা পথের ভ্রমন শেষে আপনি যখন নিঝুম দ্বীপে পৌছাবেন এখানকার কচি ডাব আপনার কান্তি দুর করবে নিশ্চয়ই। কক্সবাজার বা কুয়াকাটার মত এখানে ডাবের বিকিকিনি হয় না। যাদের ডাব গাছ আছে তাদেরকে অনুরোধ করলে হয়তো অর্থের বিনিময়ে পেয়ে যাবেন এই প্রাকৃতিক পানীয়। এখানে একটি স্থানীয় বাজার আছে। নামাবাজার। আপনি ইচ্ছা করতে এখান হতে চা, নাস্তা, দুপুর আর রাতের খাবার পেতে পারেন।

এখানে আর একটি উপভোগ্য বিষয় হলো রাতের ক্যাম্প ফায়ার আর বারবি-কিউ। অবাক হবেন না। এখানে বিখ্যাত কোন হোটেল নেই যে আপনার জন্য বারবি-কিউ করবে। তবে নিঝুম রিসোর্টের কেয়ারটেকার মনির হোসেন আপনাকে এ বিষয় পূর্ণ সহায়তা করবে। বারবি-কিউ করার জন্য উপযুক্ত যন্ত্রাপাতি তার কাছে রয়েছে। আপনি খরচের টাকা দিলেই হয়ে যাবে চিকেন বারবি-কিউ। তবে আর একটি ভিন্ন রকমের বারবি-কিউ আপনি করতে পারেন। তা হলো ইলিশ বারবি-কিউ। মৌসুমটি যদি ইলিশের হয়, তবে আপনি মহা ভাগ্যবান বলতেই হবে। এই স্বাদ আপনি মনে রাখবেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ইলিশ বারবি-কিউ, হোটেলের পরোটা আর খোলা আকাশের নিচে গলা ভরা গান যেন এক মায়াচ্ছন্ন মুহুর্তের সৃষ্টি করবে।

ইতিহাস

নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অর্ন্তগত ছোট একটি নিঝুম দ্বীপ। সবাই এটিকে দ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করলেও এটি আসলে সাগরের মোহনার অবস্থিত একটি চর। নিঝুম দ্বীপের পূর্ব নাম ছিলো চর-ওসমান। ওসমান নামের একজন বাথানিয়া তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম নঝুম দ্বীপে বসত গড়েন। তখন তার নামেই এই দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। পরে হাতিয়ার সাংসদ আমিরুল ইসলাম কালাম এই নাম বদলে নিঝুম দ্বীপ নামকরণ করেন। মূলত বল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং চুর মুরি- এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ১৪,০০০ একরের দ্বীপটি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্ত এখানে কোনো জনবসতি ছিলো না। বাংলাদেশের বনবিভাগ ৭০-এর দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের হরিণশুমারি অনুযায়ী হরিণের সংখ্যা ২২,০০০। নোনা পানিতে বেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ কেওড়া গাছের অভয়ারণ্য। ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে সুন্দরবনের পরে নিঝুম দ্বীপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলে অনেকে দাবী করেন।

যেভাবে যেতে হবে

লঞ্চঃ
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন পানামা ও টিপু ৫ নামের লঞ্চ হাতিয়ার উদ্দেশে ছাড়ে সন্ধ্যা ৬টায়। ভাড়া ডেক ২০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৭০০ টাকা, ডাবল কেবিন ১২০০ টাকা এবং ভিআইপি ১৬০০ টাকা। সময়মতো লঞ্চ ছাড়লে এবং আবহাওয়া ঠিক থাকলে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চটি পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে হাতিয়া লঞ্চঘাটে পৌছবে।

পানামা লঞ্চের যোগাযোগ : ০১৭৪০৯৫১৭২০। এ ছাড়া বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকেও সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে চট্টগ্রাম থেকে একটি জাহাজ হাতিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

হাতিয়া তমরুদ্দি লঞ্চঘাট থেকে নানাভাবে নিঝুম দ্বীপে যাওয়া যায়।

নিঝুম দ্বীপে ঘাট দুইটা: নামার ঘাট এবং বন্দর টিলা ঘাট। নামার ঘাটে রিসোর্ট হওয়াতে যেতে হবে মূলত নামার ঘাটে। সুতরাং, তমরদ্দি লঞ্চঘাট থেকে নিঝুম দ্বীপ নামার বাজারে ট্রলারে সময় লাগবে প্রায় ২:৩০ ঘণ্টা এবং বন্দর টিলা ঘাট ২ ঘন্টা, যা নির্ভর করবে জোয়ার ভাটার ওপর।

এছাড়া সড়কপথে তমরদ্দী লঞ্চঘাট থেকে নিঝুম দ্বীপ যেতে চাইলে, তমরদ্দী বাজার থেকে টেম্পুতে জাল্যাখালী (জালিয়াখালী) ঘাট অথবা বাসে করে জাহাজমারা ঘাটে এবং রিক্সাতে জাল্যাখালী (জালিয়াখালী) ঘাট যেতে হবে। তারপর, নদী পারাপারের নৌকাতে বন্দরটিলা ঘাটে পার হয়ে রিক্সা অথবা টেম্পুতে নামার বাজার যেতে হবে।
 [ads-post]
ট্রেনেঃ
প্রথমে কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে নোয়াখালী রেলওয়ে ষ্টেশন যেতে হবে। এরপরে বাসে নোয়াখালী চ্যায়ারঘাট যেতে হবে, তারপরে সী ট্রাকে হাতিয়া নলছাড়া যেতে হবে। হাতিয়া নলছাড়া থেকে ট্যাক্সিতে জাল্যাখালী (জালিয়াখালী) ঘাট যেতে হবে। তারপর, নদী পারাপারের নৌকাতে বন্দরটিলা ঘাট পার হয়ে রিক্সা অথবা টেম্পুতে নামার বাজার যেতে হবে।

নিঝুম দ্বীপে সড়কপথে গেলে প্রথমদিন নোয়াখালী পৌঁছে রাত কাটালে ভালো। নোয়াখালী শহরে নানা গেস্ট হাউস এবং হোটেল ছাড়াও রয়েছে ‘নাইস’-এর মতো অভিজাত মোটেলও। এখান থেকে সড়কপথে হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট হয়ে সি-ট্রাকে হাতিয়া অথবা স্পিডবোট নিয়ে সরাসরি যাওয়া যায় নিঝুম দ্বীপ। তবে প্রকৃতির অপরূপ আর রহস্যঘেরা দ্বীপটিকে উপভোগ করতে হলে হাতিয়া হয়ে যাতায়াত করা নির্ঝঞ্ঝাট ও নিরাপদ। কেননা নোয়াখালী হয়ে হাতিয়া আসা কিছুটা বিপদজনক হতে পারে।

কোথায় থাকবেন

নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য অবকাশ পর্যটন নির্মাণ করেছে নিঝুম রিসোর্ট এবং নামার বাজার মসজিদ কতৃপক্ষ নির্মাণ করেছে মসজিদ বোর্ডিং।

নিঝুম রিসোর্টঃ
এই রিসোর্টটি মুলতঃ একটি ঘুর্নিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র। এখানে আসার আগে এটি বুকিং দিয়ে আসাই শ্রেয়। না হলে মহা বিপদে পড়তে হতে পারে। এই রিসোর্টে নয়টি ডাবল ও ট্রিপল বেডের রুম এবং ৩টি ডরমিটরি রয়েছে যেখানে মোট ২২টি বেড রয়েছে। পুরো নিঝুম রিসোর্টে ৬০ জনেরও বেশি সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। নিঝুম রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবস্থা রয়েছে সর্বক্ষণিক বিদ্যুতের জন্য।


মসজিদ বোর্ডিং
এই বোর্ডিং-এ মোট আটটি রুম আছে। এর মধ্যে সিঙ্গল দুইটি এবং ডাবল ছয়টি। এই বোর্ডিং-এ কোনো এটাচ্ট বাথরুম এবং জেনারটরের ব্যবস্থা নাই। এখানে ২টি কমন বাথরুম এবং একটি টিউবওয়েল আছে।

এই বোর্ডিং-এ থাকার জন্য বুকিং করতে যোগাযোগ করুন: মোঃ আব্দুল হামিদ জসিম, কেন্দ্রিয় জামে মসজিদ, নামার বাজার, হাতিয়া, নোয়াখালী। ফোনঃ ০১৭২৭-৯৫৮৮৭৯।

অনুমিত খরচ

নিঝুম রিসোর্টের রুমের ভাড়াঃ

দুই বেডের (১টি বাথ রুম) ডিলাক্স রুমের ভাড়া ১ হাজার টাকা।
ছয় বেডের ফ্যামিলি রুমের (একটি চার বেডের রুম ও অন্যটি দুই বেডের রুম এবং দুইটি বাথ রুম) ভাড়া ২ হাজার টাকা। ১২ বেডের ডরমিটরির (তিনটি বাথ রুম) ভাড়া ২৪০০ টাকা এবং পাঁচ বেডের ডরমিটরির (দুইটি বাথ রুম) ভাড়া ১২০০ টাকা। রুমে অতিরিক্ত কেউ থাকলে জনপ্রতি গুনতে হবে মাত্র একশ টাকা।

মসজিদ বোর্ডিং-এর রুমের ভাড়াঃ

সিঙ্গল বেডে রুমের ১০০ টাকা এবং ডাবল বেড রুমের ভাড়া ২০০ টাকা।
ফটো গ্যালারিঃ

[ফোন নাম্বার সমূহ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত , এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে অব্যশই নিজ দায়িত্বে সতর্কতার সহিত  যোগাযোগ করতে বলা হল। কোন প্রকার অনাকাংখিত ঘটনার জন্য "সেরা-সংগ্রহ.কম" দায়ী নয়।]