আনন্দমঠ - দ্বিতীয় খন্ড বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - তৃতীয় পরিচ্ছেদ (Anandamath 2.3) - সেরা-সংগ্রহ.কম

Sunday, July 3, 2016

আনন্দমঠ - দ্বিতীয় খন্ড বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - তৃতীয় পরিচ্ছেদ (Anandamath 2.3)

আনন্দমঠ - দ্বিতীয় খন্ড

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

তৃতীয় পরিচ্ছেদ


পরদিন আনন্দমঠের ভিতর নিভৃত কক্ষে বসিয়া ভগ্নোৎসাহ সন্তাননায়ক তিন জন কথোপকথন করিতেছিলেন। জীবানন্দ সত্যানন্দকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহারাজ! দেবতা আমাদিগের প্রতি এমন অপ্রসন্ন কেন? কি দোষে আমরা মুসলমানের নিকট পরাভূত হইলাম?”
সত্যানন্দ বলিলেন, “দেবতা অপ্রসন্ন নহেন। যুদ্ধে জয় পরাজয় উভয়ই আছে। সে দিন আমরা জয়ী হইয়াছিলাম, আজ পরাভূত হইয়াছি, শেষ জয়ই জয়। আমার নিশ্চিত ভরসা আছে যে, যিনি এত দিন আমাদিগকে দয়া করিয়াছেন, সেই শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী বনমালী পুনর্বার দয়া করিবেন। তাঁহার পাদস্পর্শ করিয়া যে মহাব্রতে আমরা ব্রতী হইয়াছি, অবশ্য সে ব্রত আমাদিগকে সাধন করিতে হইবে। বিমুখ হইলে আমরা অনন্ত নরক ভোগ করিব। আমাদের ভাবী মঙ্গলের বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই। কিন্তু যেমন দৈবানুগ্রহ ভিন্ন কোন কার্য সিদ্ধ হইতে পারে না, তেমনি পুরুষকারও চাই। আমরা যে পরাভূত হইলাম, তাহার কারণ এই যে, আমরা নিরস্ত্র। গোলা গুলি বন্দুক কামানের কাছে লাঠিসোটা বল্লমে কি হইবে? অতএব আমাদিগের পুরুষকারের লাঘব ছিল বলিয়াই এই পরাভব হইয়াছে। এক্ষণে আমাদের কর্তব্য, আমাদিগেরও ঐরূপ অস্ত্রের অপ্রতুল না হয় |”
জী। সে অতি কঠিন ব্যাপার।
স। কঠিন ব্যাপার জীবানন্দ? সন্তান হইয়া তুমি এমন কথা মুখে আনিলে? সন্তানের পক্ষে কঠিন কাজ আছে কি?
সত্য। সেই মহেন্দ্রের স্ত্রী-কন্যা।
ভবানন্দ চমকিয়া উঠিলেন। তখন তিনি বুঝিলেন যে, যে স্ত্রীলোককে তিনি ঔষধবলে পুনর্জীবিত করিয়াছিলেন, সেই মহেন্দ্রের স্ত্রী কল্যাণী। কিন্তু এক্ষণে কোন কথা প্রকাশ করা আবশ্যক বিবেচনা করিলেন না।
জীবানন্দ বলিলেন, “মহেন্দ্রের স্ত্রী মরিল কিসে?”
স। বিষ পান করিয়া।
জী। কেন বিষ খাইল?
স। ভগবান তাহাকে প্রাণত্যাগ করিতে স্বপ্নাদেশ করিয়াছিলেন।
ভ। সে স্বপ্নাদেশ কি সন্তানের কার্যোদ্ধারের জন্যই হইয়াছিল?
স। মহেন্দ্রের কাছে সেইরূপই শুনিলাম। এক্ষণে সায়াহ্নকাল উপস্থিত, আমি সায়ংকৃত্যাদি সমাপনে চলিলাম। তৎপরে নূতন সন্তানদিগকে দীক্ষিত করিতে প্রবৃত্ত হইব।
ভ। সন্তানদিগকে? কেন, মহেন্দ্র ব্যতীত আর কেহ আপনার নিজ শিষ্য হইবার স্পর্ধা রাখে কি?
স। হাঁ, আর একটি নূতন লোক। পূর্বে আমি তাহাকে কখন দেখি নাই। আজি নূতন আমার কাছে আসিয়াছে। সে অতি তরুণবয়স্ক যুবা পুরুষ। আমি তাহার আকারেঙ্গিতে ও কথাবার্তায় অতিশয় প্রীত হইয়াছি। খাঁটি সোণা বলিয়া তাহাকে বোধ হইয়াছে। তাহাকে সন্তানের কার্য শিক্ষা করাইবার ভার জীবানন্দের প্রতি রহিল। কেন না, জীবানন্দ লোকের চিত্তাকর্ষণে বড় সুদক্ষ। আমি চলিলাম, তোমাদের প্রতি আমার একটি উপদেশ বাকি আছে। অতিশয় মন:সংযোগপূর্বক তাহা শ্রবণ কর।
তখন উভয়ে যুক্তকর হইয়া নিবেদন করিলেন, “আজ্ঞা করুন |”
সত্যানন্দ বলিলেন, “তোমরা দুই জনে যদি কোন অপরাধ করিয়া থাক, অথবা আমি ফিরিয়া আসিবার পূর্বে কর, তবে তাহার প্রায়শ্চিত্ত আমি না আসিলে করিও না। আমি আসিলে, প্রায়শ্চিত্ত অবশ্য কর্তব্য হইবে |”
এই বলিয়া সত্যানন্দ স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। ভবানন্দ এবং জীবানন্দ উভয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করিলেন।
ভবানন্দ বলিলেন, “তোমার উপর না কি?”
জী। বোধ হয়। ভগিনীর বাড়ীতে মহেন্দ্রের কন্যা রাখিতে গিয়াছিলাম।
ভ। তাতে দোষ কি, সেটা ত নিষিদ্ধ নহে, ব্রাহ্মণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া আসিয়াছ কি?
জী। বোধ হয় গুরুদেব তাই মনে করেন।

Post Top Ad