মহাভারতের অশ্বত্থামা এখনো জীবিত ! সত্যি না'কি গুজব? - সেরা-সংগ্রহ.কম

Sunday, July 17, 2016

মহাভারতের অশ্বত্থামা এখনো জীবিত ! সত্যি না'কি গুজব?

শোনা যেতে থাকে, অশ্বত্থামাকে দেশেই দেখা গিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও বেশ কিছু মানুষ দাবি করেছেন যে, তাঁরা অশ্বত্থামার সাক্ষাৎ পেয়েছেন।


অমরত্বের অভিশাপ কি আজও বহন করছেন অশ্বত্থামা?



ভারতীয় পরম্পরায় বেশ কিছু পৌরাণিক চরিত্রকে অমর বলে মনে করা হয়। তাঁরা হলেন— হনুমান, বলীরাজ, ব্যাসদেব, বিভীষণ, কৃপাচার্য, পরশুরাম, মার্কণ্ডেয় এবং অশ্বত্থামা। এই অমরবৃন্দ সম্পর্কে বহু কাহিনিই প্রচলিত রয়েছে। এঁদের মধ্যে শ্রীহনুমান এবং অশ্বত্থামাকে নিয়েই প্রলিত রয়েছে সব থেকে বেশি কাহিনি। হনুমানের ব্যাপারটা বোঝা যায়। তিনি এক জনপ্রিয় ‘ডেমিগড’। সারা দেশেই হনুমান পূজিত। কিন্তু অশ্বত্থামা? তাঁর সম্পর্কে কিংবদন্তি ঠিক কী কারণে আজও বহমান, তা বোঝা দুরূহ। তবে এ দেশের একটা বিরাট অংশের মানুষের বিশ্বাস, অশ্বত্থামা আজও জীবিত। এবং তাঁকে দেখাও যায়।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ দিকে কৌরবপক্ষের সেনাপতি হন অশ্বত্থামা। পাণ্ডবদের বিজয় তখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছে। অশ্বত্থামা এক রাতে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে পঞ্চপাণ্ডব ভেবে ভুল করে পাঁচ পাণ্ডব-সন্তানকে হত্যা করেন। এই কারণেই কৃষ্ণ তাঁকে এক ভয়াবহ অভিশাপ দেন। সেই অভিশাপের মর্মার্থ ছিল— অশ্বত্থামা কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত হবেন এবং সেই রোগ তাঁকে ৩০০০ বছর ধরে তাড়া করে বেড়াবে। কেউ তাঁকে আশ্রয় দেবে না। নিরন্তর ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় তাঁকে কালনিরবধি থেকে যেতে হবে। অশ্বত্থামা তাঁর সবথেকে বড় সম্পদ, তাঁর শিরোমণি পরিত্যাগ করে এই অভিশাপকে বরণ করে নেন।

তার পরে যুগের পরে যুগ অতিবাহিত হয়। পল্লবিত হতে থাকে অশ্বত্থামার কাহিনি। কখনও মানুষের ধারণা হয়, তিনি ভারতবর্ষের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। আবার কখনও শোনা যেতে থাকে, অশ্বত্থামাকে দেশেই দেখা গিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও বেশ কিছু মানুষ দাবি করেছেন যে, তাঁরা অশ্বত্থামার সাক্ষাৎ পেয়েছেন।

শোনা যাক সেই দাবির কয়েকটিকে।

মধ্যপ্রদেশের এক চিকিৎসক একবার জানান, এক অসুস্থ ব্যক্তি কপালের ঠিক মাঝখানে এক গভীর ক্ষত নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। অব্যর্থ সব ওষুধেও সেই ক্ষত সারেনি। চিকিৎসকের মনে হয়, এই ক্ষত বহু যুগের পুরনো। একে সারানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন— ‘আপনি কি অশ্বত্থামা?’ তার পরে তিনি কিছু একটা নিতে পিছন ফেরেন। মুহূর্তকাল পরে যখন তিনি সামনে তাকান, ঘরে আর কারোকে দেখতে পান না।

ভারতের বেশ কিছু যোগী দাবি করেন, তাঁরা হিমালয়ের গহীন অঞ্চলে অশ্বত্থামাকে দেখেছেন। কোনও এক মন্দিরে প্রত্যূষে অশ্বত্থামা শিবলিঙ্গে পুষ্প নিবেদন করতে আসেন। হিমালয়-পাদদেশে এক দীর্ঘকায় ব্যক্তির কথা প্রায়শই শোনা যায়, যাঁর কপালের মাঝখানে ক্ষত। তিনি নাকি এক ধাবা-মালিকের সঙ্গে বছরে একবার সাক্ষাৎ করতে আসেন। সেই একবার তিনি নাকি বিপুল পরিমাণে আহার করেন এবং প্রায় ১০০ লিটার জল পান করেন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, তিনি বছরে একবারই আহার করেন। আবার অনেকের মতে, তাঁকে সবাই দেখতে পাবেন না। কারণ, কাকে তিনি দেখা দেবেন আর কাকে দেবেন না, সেটা তাঁর নিজের বিচারের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এই কিংবদন্তির পিছনে কী কারণ থাকতে পারে? কেন অশ্বত্থামাকেই বেছে নেওয়া হয় এই রহস্য নির্মাণের জন্য? উত্তর মেলে না। অনুমান করা যায়, ‘মহাভারত’-এর সবথেকে ট্র্যাজিক চরিত্রদের অন্যতম দ্রোণপুত্রের প্রতি ভারতীয় গণচৈতন্যে কোথাও এক সমবেদনা রয়ে গিয়েছে। কৃষ্ণের অভিশাপে কুষ্ঠ রোগে বিধ্বস্ত, সহায়হীন, সম্বলহীন, অস্ত্রের গৌরবহীন একা বীর পরিভ্রমণ করে চলেছেন পথের পরে পথ, তাঁর ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই, নিদ্রা নেই— এই কল্পনা কোথাও এক মহারহস্যকে নির্মাণ করে। সেই নির্মিতি এক শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি। আর সেখানেই বোধ হয় অশ্বত্থামা অমর।

Post Top Ad