বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ ‘জাহাজপুরা’ - সেরা-সংগ্রহ.কম

Friday, February 3, 2017

বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ ‘জাহাজপুরা’

‘জাহাজপুরা’



একদিকে পাহাড়, অপরদিকে বঙ্গোপসাগর, মাঝখানে প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি গর্জন বন। নৈসর্গিক এ সৌন্দর্য যে কারো মন কেড়ে নেবে। পাহাড়, সাগর আর প্রকৃতির অপরূপ এই মেলবন্ধন টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের জাহাজপুরা গ্রাম। পাশেই ৮৮০ ফুট উঁচু পাহাড় ‘তুনঙ্গানঙ্গা’। কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এই পাহাড়ের নিচে সুন্দর নিরিবিলি গ্রাম ‘জাহাজপুরা’। গ্রামের পশ্চিম পাশে বিশাল বঙ্গোপসাগর। সাগরের বিশাল চরে হাজারো পাখির মেলা। এই সাগরে শত শত জেলে নৌকা নিয়ে মাছ ধরেন অবিরাম। সেই মাছ বিক্রি করেই চলে জাহাজপুরা গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা।

কক্সবাজার শহর থেকে সমুদ্র উপকূলীয় ‘মেরিন ড্রাইভ সড়ক’ ধরে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার গেলে নজরে পড়ে এই নির্জন গ্রাম জাহাজপুরা।

প্রায় ২০ হাজার মানুষের এই গ্রামটির পূর্ব পাশে অর্থাৎ উঁচু পাহাড়ের নিচে আকাশছোঁয়া পাঁচ হাজারের বেশি শতবর্ষী গর্জনগাছ দাঁড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই গর্জনগাছের ফল থেকে চারা সৃজন করে সারা দেশে বনায়ন করে বন বিভাগ। গর্জন বনের ভেতর হরিণ, হাতিসহ নানা বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করছে বন বিভাগের সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা ‘নিসর্গ’ সহায়তা প্রকল্প। গর্জনবনের ভেতর গেলে ঠান্ডায় মনটা ভরে যায়। গাছে গাছে দেখা মেলে শত শত বানরের লাফালাফি, নানা পাখির কিচিরমিচির। তবে বর্ষার সময় বনের ভেতর হাঁটাহাঁটিতে একটু সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। বনের ভেতর যাওয়ার আগে বনকর্মীদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গ্রামটির চতুর্দিকে দেখা মেলে শুধু মাছ আর মাছ। মেয়েরা খোলা মাঠে মাচা বানিয়ে কিংবা ঘাসের ওপর রেখে কাঁচা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করছেন। বলা যায়, পুরো গ্রামটি ‘মাছের রাজ্য’। পাহাড়ের নিচে শত শত পানের বরজ, হাজার হাজার গাছে ভর্তি অসংখ্য সুপারিবাগান। এই পান-সুপারি বিক্রি করেই সারা বছর চলে যায় গ্রামের শত শত মানুষের সংসার।

গর্জনবনের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে গেলেই প্রথমে পাহাড়ে, তারপর সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রসৈকতের বালুচরে চলাচল করে চান্দের গাড়ি। খোলা জিপ গাড়িকে এখানে চান্দের গাড়ি বলে। এই চান্দের গাড়িতে করে সাগর থেকে ধরে আনা মাছ শহরে পৌঁছানো হয়। সাগরে যখন জোয়ার থাকে তখন বালুচর বা সৈকত পানিতে ডুবে যায়। এ সময় গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। আবার ভাটার সময় পানি নেমে গেলে ভেসে ওঠা বালুচরে চলে চান্দের গাড়ি।

সমুদ্র উপকূল দিয়ে যতই অগ্রসর হবেন ততই মনটা ভরে যাবে। শত শত জেলে সারিবদ্ধভাবে জাল টেনে সাগর থেকে ধরে আনছেন মাছ। অসংখ্য গাঙচিল নৌকার ওপর উড়ে উড়ে সেই মাছ খাচ্ছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ধরে আনা মাছ জেলেরা বালুচরে রেখে দাম হাঁকেন। ফড়িয়া বা ব্যবসায়ীরা মাছের চারদিকে গোল করে দাঁড়িয়ে ওই মাছের দাম-দর করেন। ওজন দিয়ে এখানে মাছ বিক্রি হয় না। ওজন দেওয়ার সময়ও নেই জেলেদের। জেলেরা আন্দাজ করে মাছের একটা দাম বলে দেন। তারপর ব্যবসায়ীরা একেকজন দাম হাঁকেন। যাঁর দাম সর্বোচ্চ, তাঁর কাছেই মাছ বিক্রি করা হয়।
 [ads-post]
ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পাহাড়ের ওপর একটি যুদ্ধবিমান (জাহাজ) ছিটকে পড়েছিল। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে বিধ্বস্ত জাহাজটি পুড়ে গিয়েছিল। সেই থেকে গ্রামের নামকরণ ‘জাহাজপুরা’। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার সমুদ্র উপকূলীয় বাহারছড়া ইউনিয়নের এটি একটি ছোট্ট গ্রাম। কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় ‘পুরা’ শব্দের অর্থ ‘পুড়ে যাওয়া’। অনেকে বলেন, জাহাজ পড়ে গিয়েছিল বলে ‘জাহাজপড়া’ থেকে ‘জাহাজপরা’ বা ‘জাহাজপুরা’ হয়েছে।

যেভাবে যেতে হবে

কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে হিমছড়ি, সোনারপাড়া, ইনানি, মনখালী হয়ে জাহাজপুরা গর্জনবনে পৌঁছানো যায়। সময় লাগে প্রায় ঘন্টাখানেক। কক্সবাজার শহর থেকে মাইক্রোবাস, ট্যাক্সি অথবা চান্দের গাড়ি ভাড়া নিয়ে দিনের বেলায় আসা-যাওয়া করা যায়। ভাড়া নেবে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। জাহাজপুরায় থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসা নিরাপদ।

কোথায় থাকবেন

টেকনাফের হোটেলগুলোতে থাকতে পারেন। আর একটু আয়েশ করে থাকতে চাইলে কক্সবাজারই উত্তম।

Post Top Ad